ব্যাংক খাতে বড় সিদ্ধান্তে আপাতত পরিবর্তন আসছে না। ইতোমধ্যে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক আগের মতোই এক কাঠামোয় পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা খোলা থাকছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল আকারে তোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। এ জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করে আগামী রোববারের মধ্যে সুপারিশ জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশোধনী চূড়ান্ত হলে তা সংসদে উত্থাপন করা হবে।
এর মধ্যেই পরিষ্কার করা হয়েছে, বর্তমানে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও কিছু ব্যাংক একীভূত বা অবসায়নের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়ন হবে কি না—তা নির্ভর করছে আইন সংশোধনের ওপর।
গত বছরের মে মাসে জারি হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী একত্র করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। নতুন এই ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হচ্ছে আমানতকারীদের মধ্যে।
এ ছাড়া আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পুরো অর্থ ফেরতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলাদা একটি স্কিমও চালু করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যায়। এ কারণে অধ্যাদেশগুলো যাচাই করতে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। তারা ব্যাংক রেজল্যুশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধনের সুপারিশ করেছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে মতভেদও রয়েছে। বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাসের পক্ষে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। তাদের মতে, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন কমিটি সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করবে। এরপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, অধ্যাদেশ সংশোধন বা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত এর আওতায় নেওয়া সব কার্যক্রম বৈধ থাকবে। তিনি আরও বলেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ শুধু অধ্যাদেশের ভিত্তিতে হয়নি, ব্যাংক কোম্পানি আইনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আরও কয়েকটি ব্যাংক নিয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ন্যাশনাল, এবি ও আইএফআইসি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই শেষ হলেও পরবর্তী পদক্ষেপ এখনো স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছে। সংস্থাটির পরবর্তী ঋণ কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করে সাময়িকভাবে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী একীভূতকরণ, অবসায়ন, বিক্রি বা নতুন শেয়ার ইস্যুর মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে পৃথক একটি বিভাগও গঠন করা হয়েছে।
মূলত কিছু ব্যাংক আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রেজল্যুশন পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করে আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে আমানতকারীদের সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখাই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।

