সম্মিলিতভাবে পাঁচটি ব্যাংকসহ আর্থিক সংকটে থাকা অন্যান্য ব্যাংককে সুনামসম্পন্ন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হলে এসব ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা দ্রুত ফিরে আসবে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারধারীদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য আমানতকারীদের সহযোগিতা চাইলে তারা তা দিতে পিছপা হবেন না বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর দেশ বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হলেও আমানতকারীদের আন্দোলনে নামার ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। ব্যাংক খাতে কাজ শুরুর শুরুর দিকের একটি প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলা হয়, প্রশিক্ষকরা সব সময় সতর্ক করতেন যেন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা গ্রাহকের সামনে প্রকাশ না পায়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, কোনো ব্যবস্থাপক যদি হতাশ হয়ে গ্রাহকের সামনে বলেন, “এই মাসে বেতন হবে কিনা নিশ্চিত নই”, তাহলে গ্রাহকের মনে ব্যাংকের প্রতি আস্থা ভেঙে যেতে পারে।
এ ধরনের মন্তব্য শুনে গ্রাহকের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। তিনি তখন নিজের সঞ্চিত অর্থ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আশপাশের মানুষকেও একই তথ্য জানাতে পারেন। এর ফলে ধীরে ধীরে পুরো সমাজে সংশয় ছড়িয়ে পড়ে যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আমানত রাখা নিরাপদ নয়। শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা ব্যাংকের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
এ কারণে অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা সব সময় গোপনীয়তা ও সংযম বজায় রাখেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের ব্যাংক খাতের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধানের কিছু মন্তব্য নিয়ে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ব্যাংককে “সবুজ” এবং কিছু ব্যাংককে “হলুদ” শ্রেণিতে ভাগ করে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং অনেকে অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে বারবার বলেন, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একত্র করে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু সময় পর আবার এসব ব্যাংক বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়। এসব বক্তব্য আমানতকারীদের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এদিকে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ওই পাঁচটি ব্যাংকে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা অনেকটাই সীমিত করা হয়। ফলে ব্যাংকগুলো চরম তারল্য সংকটে পড়ে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় একীভূতকরণ ছাড়া বিকল্প নেই। তবে অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় সহায়তা বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কি ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা সীমিত করা হয়েছিল কিনা। বিষয়টি বিশ্লেষণ করে কেউ কেউ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উদাহরণ টেনে বলেছেন, দীর্ঘদিন অবরোধে দুর্বল করে কোনো দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পর আঘাত হানা হয়, যার সঙ্গে এই পরিস্থিতির মিল খুঁজে পান অনেকে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতের আস্থা, নীতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা, আস্থা পুনর্গঠন এবং সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্তই এ সংকট থেকে উত্তরণের মূল চাবিকাঠি হতে পারে।
স্বতঃসিদ্ধ যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বে নির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরে থেকে প্রেষণে বা অস্থায়ীভাবে কাউকে এনে দায়িত্ব দিলে সেই প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক ও দক্ষভাবে পরিচালিত হয় না। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আংশিকভাবে কার্যক্রম চললেও বেসরকারি খাতে এমন ব্যবস্থার ইতিবাচক নজির খুব কমই দেখা যায় বলে মত রয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের মধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুনাফা বৃদ্ধি এবং গ্রাহক সেবা উন্নয়নের যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থাকে, সেখানে বাইরে থেকে আনা কোনো প্রশাসক বা অতিথি ধরনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সেই একই ধরনের ব্যবসাবান্ধব আগ্রহ তৈরি হয় না। কারণ তিনি জানেন, এই দায়িত্ব স্থায়ী নয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর আগের অবস্থানে ফিরে যাবেন। ফলে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাও কম থাকে।
সম্মিলিতভাবে পরিচালিত পাঁচটি ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগের প্রায় ছয় মাস অতিক্রম করেছে। এই সময়ে শাখা পর্যায় থেকে প্রধান কার্যালয়ে যেসব সমঝোতামূলক নিষ্পত্তি প্রস্তাব এবং ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর অনুমোদন কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
সমঝোতামূলক নিষ্পত্তি প্রস্তাবের মাধ্যমে সাধারণত ঋণের একটি অংশ মওকুফ করে বাকি অংশ আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রেষণে আসা প্রশাসকরা আদায়ের চেয়ে জবাবদিহিতার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা ভবিষ্যতে কেন ছাড় দেওয়া হলো, কেন পুরোপুরি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এসব প্রশ্নের জবাবদিহিতার ঝুঁকিকেই বেশি বিবেচনায় নেন।
এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, কোনো গ্রাহকের সঞ্চয়ী হিসাবে যদি ৫০ লাখ টাকা থাকে, তাকে হয়তো ২ লাখ টাকা দিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বাকি অর্থ কবে ফেরত মিলবে, তার নিশ্চয়তা না থাকায় একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সফলতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
আবার কারও ২ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত থাকলেও তাকে কোনো অর্থ না দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে করে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ স্কিমে যারা অর্থ রেখেছিলেন, তারা মেয়াদ শেষে সেই অর্থ দিয়ে হজ পালন, সন্তানের বিয়ে বা বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সেই অর্থ কবে ফেরত মিলবে, তার নিশ্চয়তা না থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকার বিষয়টি অনুধাবন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, যিনি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবেও পরিচিত, তার দায়িত্বকালেও প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর এই ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আন্দোলন চলাকালে আমানতকারীদের স্বার্থ নিয়ে উচ্চ পর্যায় থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য না আসার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
একইভাবে অর্থ উপদেষ্টার অবস্থান নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানও সাধারণ আমানতকারী ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিলেন না বলে অভিযোগ করা হয়। এতে বহু বিনিয়োগকারী হঠাৎ করেই দেখেন, তাদের শেয়ারের বিনিয়োগ এক নির্দেশে শূন্য হয়ে গেছে।
প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার আমানতের সুরক্ষা দাবি করছেন। তাদের মতে, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া কার্যকর না হয়ে বরং আরও জটিলতা তৈরি করেছে। আস্থা ফেরানোর পরিবর্তে দিন দিন অনাস্থা বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, নির্বাচিত সরকার এখন বিকল্প পথ বিবেচনা করছে। যে ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে না, সেটি দীর্ঘায়িত না করে নতুন কাঠামোর দিকে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত হতে পারে বলেও মত দেওয়া হচ্ছে।
সম্মিলিতভাবে পরিচালিত পাঁচটি ব্যাংকসহ আর্থিক সংকটে থাকা অন্যান্য ব্যাংককে যদি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির উদ্যোক্তাদের হাতে হস্তান্তর করা যায়, তাহলে খুব দ্রুতই এসব ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য আমানতকারীদের সহযোগিতা চাওয়ার ক্ষেত্রে যদি তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না করা হয়, বিশেষ করে ‘হেয়ারকাট’ বা আমানতের মূল অংশে ক্ষতি না করে এবং তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলনের নিশ্চয়তা বজায় রাখা হয়, তাহলে আমানতকারীরা সহযোগিতায় আগ্রহী হবেন। এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে হলে আন্দোলনরত ও নেতৃত্বদানকারী আমানতকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন। এতে পুরো প্রক্রিয়া আরও গঠনমূলক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়।
ঋণ পুনরুদ্ধার ও পুনঃতফসিল প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের শর্ত শতভাগ অনুসরণ না করে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো গেলে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি করতে পারে বলেও অভিমত রয়েছে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন ব্যাংকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ঋণ আদায় আরও দ্রুত সম্ভব হবে।
এমন নীতিগত নমনীয়তা গ্রহণ করা হলে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কমে আসবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। এর ফলে ধীরে ধীরে এসব ব্যাংক আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং সামগ্রিক ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
ড. এসএম আবু জাকের: সাবেক ব্যাংকার ও ভাইস প্রেসিডেন্ট, অর্থনীতি সমিতি-চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার।

