ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের মধ্যে আন্দোলনকারীদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে যারা কর্মসূচি পালন করছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকটির আমানতকারী বা গ্রাহক কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ধরনের রাস্তার আন্দোলন বা চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না। তিনি জানান, আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন ব্যানার ও পরিচয়ে কর্মসূচি পালন করছেন, ফলে তাদের প্রকৃত পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, জনস্বার্থ এবং আইনগত কাঠামোর ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কোনো গোষ্ঠীর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বাতিল করার সংস্কৃতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও আশ্বস্ত করেন মুখপাত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এখনও দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় প্রতিষ্ঠানটির পাশে রয়েছে। তিনি গ্রাহক, আমানতকারী, প্রবাসী আয় প্রেরণকারী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ব্যাংকটির ওপর আস্থা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তিনি বলেন, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পরিচালনা পর্ষদের সর্বশেষ ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগ গ্রহণ এবং স্থায়ী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটছে না।
এক প্রশ্নের জবাবে আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংকের গ্রাহক বা আমানতকারী নিজেদের হাতে ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ চাওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। যদিও বিষয়টি আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তবে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো—যাদের হাতে দায়িত্ব থাকবে তারা যেন আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।
নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। তিনি বলেন, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক বা নৈতিক অনিয়মের প্রমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নেই। অতীতে যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী তদন্তে সেসব অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তও পরবর্তীতে সংশোধন করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও নাকচ করে দেন তিনি। তার মতে, দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ভার্চ্যুয়াল বোর্ড সভা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জানান, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সভার অনুমতি দিয়েছিল। নতুন চেয়ারম্যানের ব্যাংকে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কা এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প ব্যবস্থায় বৈঠক আয়োজন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অতীতে নানা সংকট মোকাবিলা করেও ব্যাংকটি টিকে থেকেছে এবং বর্তমানে এর তারল্য, কার্যক্রম বা আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পুনর্বহালসহ সাত দফা দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা। নিজেদের ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ পরিচয়ে তারা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেন।
এর আগে একই দাবিতে আরেকটি ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরে সেই কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এদিকে আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনার সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের ওপর বলপ্রয়োগ অনাকাঙ্ক্ষিত এবং নিন্দনীয়। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত দাবির প্রতিও সমর্থন জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক বিরোধ মূলত নেতৃত্ব ও পরিচালনা কাঠামোকে কেন্দ্র করে হলেও এর প্রভাব ব্যাংকটির গ্রাহক আস্থা এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তির ওপরও পড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

