সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে বিতর্কিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তনের সুযোগ বন্ধ করতে যাচ্ছে সরকার। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে যুক্ত হওয়া বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাতে সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বাড়বে এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ আরও গ্রহণযোগ্য হবে।
গত ১০ এপ্রিল ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয় সরকার। তবে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার আগে নতুন করে যুক্ত করা হয় ১৮(ক) ধারা। ওই ধারায় বলা হয়েছিল, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশন বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার আওতায় যাওয়ার আগে যারা শেয়ারধারী ছিলেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পরবর্তীতে আবারও সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ বা দায়ভার গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও একই সুযোগ দিতে পারবে।
ধারাটি যুক্ত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং সুশাসনবিষয়ক সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, অতীতে বিতর্কিতভাবে পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোর ওপর একই গোষ্ঠীর প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংককে কেন্দ্র করেই মূলত এই বিতর্কের সূত্রপাত। পুনর্গঠন পরিকল্পনার আওতায় এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংক আগে একটি বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। ব্যাংকভেদে খেলাপি ঋণের হার আরও উদ্বেগজনক। ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রায় ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামীর ক্ষেত্রে এই হার ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামীর ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামীর ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় মাত্রার খেলাপি ঋণ কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সংকেত। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের নামে বিপুল অর্থ বের হয়ে গেলেও যথাযথ আদায় না হওয়ায় এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, বিতর্কিত ধারাটি বাতিলের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, আইনটি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা বাড়ছিল। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকেও আপত্তি উঠে আসে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
সরকার বর্তমানে আর্থিক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও সার আমদানিসহ বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিতর্কিত ধারা বহাল থাকলে প্রায় ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারত।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেও শক্তিশালী ও পর্যাপ্ত মূলধনসমৃদ্ধ ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। তাদের মতে, দুর্বল ও স্বল্প মূলধনসম্পন্ন ব্যাংকের সমস্যা কার্যকরভাবে সমাধান করতে হলে আইনি কাঠামোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন কাঠামো প্রথম চালু করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ মে। তখন লক্ষ্য ছিল গভীর সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করে আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। পরবর্তীতে এসব ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে ছড়িয়ে থাকা ঝুঁকি একটি কাঠামোর মধ্যে এনে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।
নতুন একীভূত ব্যাংকের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা। আরও সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানত বিমা তহবিলের অর্থকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে। অবশিষ্ট সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করে। তবে ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে সরকারকে আরও অর্থ সহায়তা দিতে হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে পুরোনো মালিকদের পুনরায় ব্যাংকে ফেরার সুযোগ রাখার প্রস্তাব ছিল না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সংসদে বিল উত্থাপনের আগে শেষ মুহূর্তে বিতর্কিত ধারাটি সংযোজন করা হয়েছিল।
এ কারণে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছিল, দুর্বল ব্যাংকের আগের শেয়ারধারীদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে আবারও অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক লুটপাটের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও ছিল। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক উদ্ধার করতে হচ্ছে। যদি বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাইরে অন্য কোনো বিনিয়োগকারী ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হতেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর চাপ কমতে পারত।
বর্তমানে বিতর্কিত ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে। এটি কার্যকর করতে আইনি সংশোধন প্রয়োজন হবে। জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে সংশোধনী আনা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
তবে অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, ধারা বাতিলের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা হবে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা ও সংস্কারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে এটি সংকটে পড়া ব্যাংক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে দেশি-বিদেশি অংশীজনদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তাও পৌঁছে দেবে।

