বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন আরও প্রতিযোগিতামূলক, সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে নতুন সুপারিশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি, বেতন, অনুদান ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন কোনো একটি নির্দিষ্ট পেমেন্ট গেটওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিবর্তে সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতার জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নীতিমালা সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব একটি মাত্র পেমেন্ট গেটওয়ের ওপর নির্ভরশীল হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কোনো কারিগরি ত্রুটি, সিস্টেম বিভ্রাট বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবার ভোগান্তি বাড়তে পারে।
বর্তমান নীতিমালার আওতায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের আয় নির্দিষ্ট একটি সরকারি পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই ব্যবস্থা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তৃত সুযোগের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং একাধিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হলে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবহারকারীরা নিজেদের সুবিধামতো মাধ্যম বেছে নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশে বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত একাধিক পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর এবং বেসরকারি ব্যাংক আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট গেটওয়ে পরিচালনা করছে। তাদের অনেকেরই শিক্ষা ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ফি পরিশোধ, হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক তথ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নত সুবিধা দিয়ে থাকে। এসব সেবাকে কাজে লাগানো গেলে পুরো খাত আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একটি মাত্র গেটওয়ের ওপর নির্ভরতা বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত করে। প্রতিযোগিতা না থাকলে সেবার উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের গতি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত সেবা দিতে আগ্রহী হবে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি নীতিমালা জারি করে। ওই নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব বা সরকারি মালিকানাধীন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, স্বচ্ছতা বজায় রেখেও আরও উন্মুক্ত ও বহুমাত্রিক ডিজিটাল পেমেন্ট কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও উল্লেখ করেছে, বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রচলিত কাগজনির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং অন্যান্য আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে লেনদেন দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ হবে। পাশাপাশি নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রবণতাও কমবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা নিজেদের পছন্দের ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ফি জমা দিতে পারবেন। এতে অতিরিক্ত অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন কমবে এবং সেবা গ্রহণ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে লেনদেন ব্যয় কমারও সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা খাতের আর্থিক লেনদেনকে একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ না রেখে উন্মুক্ত করা হলে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ত্বরান্বিত হবে। পাশাপাশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক—সবার জন্যই সুফল বয়ে আনতে পারে।
এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ বিবেচনা করে নীতিমালায় পরিবর্তন আনে কি না, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা খাতের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

