দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল ও তার পদত্যাগের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন একদল গ্রাহক ও অংশীজন। ফলে ব্যাংকটির প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
বুধবার সকালে রাজধানীর দিলকুশায় অবস্থিত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় গিয়ে সমাবেশ করেন। সেখানে বক্তারা চেয়ারম্যানের নিয়োগের বিরোধিতা করে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করতে ব্যাংকে প্রবেশের চেষ্টা করলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। তাদের দাবি, ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষার জন্য বর্তমান সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। তাদের আশঙ্কা, অতীতে যেসব বিতর্কিত ঘটনার কারণে ব্যাংকটি আলোচনায় এসেছিল, সেসব পরিস্থিতি আবারও ফিরে আসতে পারে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে একমত নয়।
টানা আন্দোলনের কারণে ব্যাংকের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রথম দিনের কর্মসূচির সময় পরিচালনা পর্ষদের নির্ধারিত বৈঠক সরাসরি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। পরে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয় এবং নতুন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নিয়োগ বা অপসারণের সিদ্ধান্ত রাজপথের আন্দোলনের ভিত্তিতে নেওয়া হবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
এদিকে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কয়েকটি অভিযোগ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচিত অনেক তথ্য যাচাই করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, চলমান সংকট কেবল চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন কাঠামো এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয়ও জড়িত। বিশেষ করে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিদায় এবং নতুন নেতৃত্বের আগমনকে ঘিরে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে গত এক দশকে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে একাধিক বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে ব্যাংকটি। বিভিন্ন সময়ে ঋণ বিতরণ, করপোরেট সুশাসন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ আমানতভিত্তিক ব্যাংকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়। তাই যেকোনো বিতর্ক দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সমাধান করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে ঘিরে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে যায়, সেদিকেই নজর রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, গ্রাহক এবং বিনিয়োগকারীদের। কারণ এই সংকটের সমাধান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, দেশের আর্থিক খাতের আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

