রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, বাড়তি পরিচালন ব্যয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের চাপে চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ ইতোমধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিয়েছে সরকার, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে সরকারের ঋণ গ্রহণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব হলেও বর্তমানে সেই খাতেই বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। শুল্ক ও কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় ব্যয় মেটাতে বিকল্প উৎস হিসেবে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহে সরকারের ধারাবাহিক অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় রাজস্ব ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় রাজস্ব সংগ্রহে চাপ আরও বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে তার প্রায় পুরো অংশই এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। মোট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। বাকি ১ লাখ ৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা দিয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক। মূলত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংকঋণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। ১০ মে পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক অর্থবছরের মধ্যেই ঋণের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বর্তমানে সরকারের মোট বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় ক্ষেত্রেই ঋণের চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এতে শিল্প ও ব্যবসা খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার মাধ্যমে সরকারের নিজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি কমাতে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ব্যাংকঋণের বিকল্প উৎস বাড়াতে সরকারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে এবং বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
এদিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করা হচ্ছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এত বড় আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণের পরও বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। ফলে ভবিষ্যতেও সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করতে হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ঋণ বৃদ্ধির নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। রাজস্ব আহরণে গতি না এলে এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না ফিরলে আগামী বছরগুলোতে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।

