দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার।
বর্তমানে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকে অবসর-পরবর্তী পেনশন সুবিধা না থাকায় কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘প্রগতি’ নামে বিশেষ পেনশন স্কিমে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ওই সভায় আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাংক খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রগতি স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী অবসর জীবনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সুরক্ষা পান না। সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে পেনশন সুবিধা ভোগ করলেও বেসরকারি খাতে এমন সুযোগ সীমিত। ফলে চাকরি শেষে আয় বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিটি শাখায় সর্বজনীন পেনশনসংক্রান্ত আলাদা সেবা ডেস্ক স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো, গ্রাহকসেবা কার্যক্রমে পেনশন কর্মসূচির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম অংশ ছিল বেসরকারি খাতে কর্মরত মানুষের বার্ধক্যকালীন আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মজীবনের একটি অংশে নিয়মিত সঞ্চয়ের মাধ্যমে অবসরের পর স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
প্রগতি স্কিম মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় মাসিক চাঁদার অর্ধেক কর্মী এবং বাকি অর্ধেক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে। মাসিক চাঁদার পরিমাণ এক হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ পনেরো হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর অংশগ্রহণকারীরা আজীবন মাসিক পেনশন পাবেন। পাশাপাশি চাঁদার বিপরীতে কর-সুবিধা, পেনশন আয়ে করমুক্ত সুবিধা এবং নির্দিষ্ট অংশ এককালীন উত্তোলনের সুযোগও রাখা হয়েছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি থাকায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি তুলনামূলক নিরাপদ সঞ্চয়ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সভায় পেনশন কর্মসূচিকে আরও গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার বিভিন্ন প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালু, মনোনীত উত্তরাধিকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের আউটসোর্সিং কর্মীদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির সর্বশেষ অগ্রগতি অনুযায়ী, প্রগতি, প্রবাস, সুরক্ষা ও সমতা—এই চারটি স্কিমে নিবন্ধিত সদস্যের সংখ্যা তিন লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জনে পৌঁছেছে। অংশগ্রহণকারীদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা, যা বিনিয়োগজনিত মুনাফা যোগ হয়ে বর্তমানে ২৮৬ কোটির কাছাকাছি অবস্থান করছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছে। এর মধ্যে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে চাঁদা সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে বেসরকারি ব্যাংক খাতে এক লাখেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশ যদি প্রগতি স্কিমে যুক্ত হন, তাহলে শুধু অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের সঞ্চয়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোও আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিধি বাড়বে এবং বার্ধক্যে আয়-অনিশ্চয়তা কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে এই উদ্যোগ।

