দেশের দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা আংশিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করতে বিশেষ আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক্-অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে একটি কোম্পানি বা শিল্প গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।
বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত–সহায়ক প্রাক্-অর্থায়ন স্কিম’ শীর্ষক নীতিমালা প্রকাশ করে। উৎপাদন কার্যক্রম বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে অর্থনীতিকে চাঙা করতে বিভিন্ন খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই নতুন তহবিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও বাজার সুবিধা থাকলেও চলতি মূলধনের অভাবে তারা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। আবার কিছু কারখানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতেই এই অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
তহবিলের আওতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের স্বল্পসুদী ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ সরবরাহ করবে এবং ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে তা উদ্যোক্তাদের ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে। বর্তমানে প্রচলিত ঋণের সুদের হার যেখানে ১৪ শতাংশের বেশি, সেখানে এই সুবিধা উদ্যোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি এনে দেবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণের মেয়াদ এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজন ও ঋণগ্রহীতার সক্ষমতার ভিত্তিতে তা নবায়ন করা যাবে। এছাড়া ঋণ নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাস কিস্তি পরিশোধে ছাড় থাকবে, ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন পুনরায় শুরু করার জন্য কিছুটা সময় পাবে।
জাতীয় শিল্পনীতির আওতায় সংজ্ঞায়িত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের বন্ধ বা আংশিকভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো এই স্কিমে অগ্রাধিকার পাবে। একই সঙ্গে রফতানিমুখী এবং প্রচ্ছন্ন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কোনও দক্ষ উদ্যোক্তা যদি বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেন, তিনিও এই তহবিল থেকে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এতে দীর্ঘদিন অচল থাকা শিল্প ইউনিটগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে ঋণ সুবিধা পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য অনুযায়ী খেলাপিমুক্ত হতে হবে। অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
ঋণের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে। শ্রমিকদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন পরিশোধের সুযোগ থাকবে। তবে পুরোনো ঋণ শোধ বা সমন্বয়ের জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।
তহবিলের অর্থ যথাযথ খাতে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ও আয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং প্রতি তিন মাসে কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকও সরাসরি তদন্ত ও পরিদর্শন করতে পারবে।
ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত না এলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয় করা হবে এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই তহবিল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প সুদে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারে সহায়ক হবে।

