সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—যেখানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, সেখানে আবার বাজার থেকে ডলার কেনার প্রয়োজন কেন?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিষয়টি শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রফতানি ও প্রবাসী আয়কে উৎসাহিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কী? একটি দেশের হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়কে রিজার্ভ বলা হয়। বিদেশি ঋণ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই তহবিল ব্যবহার করা হয়।
তবে অনেকের ধারণার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি রফতানি আয় বা প্রবাসীদের পাঠানো ডলার গ্রহণ করে না। এসব অর্থ প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে জমা হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই ডলার কিনে রিজার্ভে যুক্ত করে। ফলে রিজার্ভ বাড়াতে হলে বাজার থেকেই ডলার সংগ্রহ করতে হয়।
বাজারে ডলার বেশি হলে কী ঘটে? কিছুদিন আগেও দেশে ডলারের সংকট ছিল। সে সময় আমদানি ব্যয় সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয় উন্নত হওয়া এবং অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে অনেক ব্যাংকের কাছেই অতিরিক্ত ডলার জমা হচ্ছে।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও পণ্যের সরবরাহ বেড়ে গেলে তার দাম কমে। ডলারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে যদি ডলারের মূল্য দ্রুত কমে যায়, তাহলে রফতানিকারক ও প্রবাসী আয় প্রেরণকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন প্রবাসী যদি এক হাজার ডলার দেশে পাঠান, ডলারের বিনিময় হার কমে গেলে তিনি কম টাকার সমপরিমাণ অর্থ পাবেন। একইভাবে রফতানিকারকদেরও রফতানি আয়ের বিপরীতে কম টাকা হাতে আসবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ শোষণ করে নেয়। এতে ডলারের মূল্য হঠাৎ কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয়কে অনেক অর্থনীতিবিদ বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পরিচালনার একটি নীতি-উপকরণ হিসেবে দেখেন। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনে, তখন একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে বাজারে ডলারের বাড়তি সরবরাহ কমে যায়। ফলে বিনিময় হার একটি গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি খুব দ্রুত কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। উভয় পরিস্থিতিতেই ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব হলো বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা।
কেন আগে ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল? গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা চাপ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ডলারের সংকট দেখা দেয়।
সে সময় জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, সারসহ জরুরি আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারে সরবরাহ করতে হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে বাজার থেকে ডলার কিনে তা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও বাজারভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের একটি রেফারেন্স রেট নির্ধারণ করে এবং বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। যদি ডলারের মূল্য অতিরিক্ত নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনে বাজারে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে বিনিময় হার চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের প্রভাব পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ে। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় ও বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ে। একই সঙ্গে ডলারের বাজার স্থিতিশীল থাকলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে বড় ধরনের ওঠানামা কম হয়। এছাড়া রেমিট্যান্স ও রফতানি খাত উৎসাহ পায়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। শক্তিশালী রিজার্ভ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছেও দেশের আর্থিক সক্ষমতার ইতিবাচক বার্তা দেয়।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা কিংবা রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রফতানি খাতের বৈচিত্র্য বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা বা বৈদেশিক লেনদেনের চাপ আবারও ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত তিনটি উদ্দেশ্যে বাজার থেকে ডলার কিনে থাকে—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতকে সহায়তা করা। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার কেনাকে সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে নয়, বরং বাজারে বাড়তি ডলার সরবরাহের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার একটি কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

