সরকার করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদারের লক্ষ্যে ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে প্রস্তাব আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাব কার্যকর হলে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার পাশাপাশি বিদ্যমান হিসাব সচল রাখার ক্ষেত্রেও টিআইএন থাকা প্রয়োজন হবে।
তবে শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতা গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং সরকারি গেজেটের মাধ্যমে কর অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ ছাড় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর ফলে সাধারণ করদাতাদের আওতা বাড়লেও নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির মানুষ বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে পারেন।
বর্তমানে দেশে কোটি কোটি ব্যাংক হিসাব থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিসাবধারীর টিআইএন নেই। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী টিআইএন না থাকলে ব্যাংক আমানতের সুদের ওপর বেশি হারে উৎসে কর কাটা হয়। কিন্তু ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য সরাসরি টিআইএন বাধ্যতামূলক ছিল না। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে কর শনাক্তকরণ ব্যবস্থার আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হবে।
রাজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তথ্যনির্ভর করতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকিং তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ইউটিলিটি সেবার তথ্য এবং ভূমি নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তির আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সহজ হবে এবং কর ফাঁকি শনাক্ত করাও তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠবে।
এনবিআর করজাল সম্প্রসারণে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক নিবন্ধন নম্বর চালু করা এবং খুচরা ব্যবসা খাতে নতুন কর কাঠামো প্রবর্তন। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতির এমন খাতগুলোকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা, যেগুলোর একটি বড় অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর বাইরে রয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকিং খাত ও কর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। ব্যাংকারদের একাংশ মনে করছেন, বাধ্যতামূলক টিআইএন নীতির কারণে অনেক সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে অনাগ্রহী হতে পারেন। অতীতে কিছু আর্থিক পণ্যের ক্ষেত্রে একই ধরনের শর্ত আরোপের পর গ্রাহকসংখ্যা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এমন সিদ্ধান্ত ব্যাংকে নতুন হিসাব খোলার প্রবণতা এবং নিয়মিত লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন কারণে জনগণের একাংশের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন শর্ত আরোপের আগে সেই আস্থাহীনতা দূর করা জরুরি। অন্যথায় মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তে বিকল্প উপায়ে লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অন্যদিকে কর বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন যুক্ত করা হলে কর প্রশাসন আরও কার্যকর হবে। কারণ এতে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আয়-ব্যয়ের তথ্য যাচাই সহজ হবে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কর ফাঁকি ও অপ্রদর্শিত সম্পদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তথ্যভিত্তিক নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তারা সতর্কও করেছেন যে নগদনির্ভর অর্থনীতিতে হঠাৎ কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গতিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নতুন উদ্যোক্তা এবং নিম্নআয়ের মানুষের একটি অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারেন। এর ফলে নগদ লেনদেনের প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি ও তারল্য পরিস্থিতিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা কার্যকরের আগে ধাপে ধাপে ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা উচিত। একই সঙ্গে কর রিটার্নের সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংযুক্ত করা, অনলাইনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ করা এবং জাতীয় সম্পদ তথ্যভান্ডারকে কর ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে করদাতার সংখ্যা বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপও কমবে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। তবে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক হিসাব থাকায় প্রকৃত হিসাবধারীর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। এমন বাস্তবতায় টিআইএন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ দেশের কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

