দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বড় অঙ্কের আমানত কমে যাওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্রাহক অসন্তোষ, বিক্ষোভ এবং চলমান প্রশাসনিক টানাপোড়েনের প্রভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের আস্থা ও স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, ৩১ মে ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। ৭ জুনের মধ্যে তা নেমে আসে ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ সাত দিনের ব্যবধানে আমানত কমেছে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। এই সময়ে বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ বাড়ে বলে জানা যায়।
ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২৪ মে নিয়োগ পাওয়া নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে ১ জুন থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়, যার প্রভাব সরাসরি ব্যাংকের কার্যক্রমে পড়ে। মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের জমায়েত এবং কর্মসূচি ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায়।
ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, চলমান অস্থিরতা ও নেতিবাচক প্রচারণার কারণে অনেক গ্রাহক তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে মৌসুমি আর্থিক চাপ এবং কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের চাহিদাও পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। তার মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংকটির শেয়ারবাজারে অবস্থান নিয়েও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ‘জেড’ শ্রেণিতে অবনমন হওয়াকে অনেকে বিনিয়োগ ও আস্থার সংকেত হিসেবে দেখছেন। এতে করে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্রাহক আন্দোলনের পেছনে একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে, যারা বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, আমানতের নিরাপত্তা এবং পূর্ববর্তী অনিয়মের তদন্ত। তবে এসব আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোনো ব্যাংকের সঙ্গে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় যুক্ত হয়ে পড়া দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা বজায় রাখতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে ব্যাংকটির অনাদায়ী ঋণের চাপও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। প্রায় অর্ধেকের বেশি ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার বড় অংশ একটি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানা গেছে। এসব ঋণ আদায়ে অগ্রগতি খুবই সীমিত, যা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে গ্রাহকের আস্থাহীনতা—এই দুইয়ের সম্মিলিত চাপেই ব্যাংকটি বর্তমানে সংবেদনশীল সময় পার করছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আমানত প্রবাহ ও সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে আরও প্রভাব পড়তে পারে।

