ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, রপ্তানিকারক এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে ১৯ হাজার কোটি টাকার চারটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই উদ্যোগ একদিকে যেমন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ৭ ও ৮ জুন জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন এই তহবিলগুলোর ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প ও কারখানার জন্য এক হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদহার, তারল্য সংকট এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
চারটি তহবিলের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ করা হয়েছে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য। ১০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলের লক্ষ্য হলো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশের কৃষক, খামারি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে এই অর্থায়নের আওতায় আসতে পারবেন।
এই তহবিলের আওতায় ফসল উৎপাদন, মৎস্যচাষ, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, কৃষিযন্ত্র ক্রয়, সেচ ব্যবস্থা এবং আয়বর্ধক কৃষি কার্যক্রমে ঋণ দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত ছাড়াই ঋণ নিতে পারবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকদের জন্য এটি বড় ধরনের স্বস্তির খবর।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গঠিত ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কার্যকর মূলধনের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
নতুন তহবিলের মাধ্যমে এসব উদ্যোক্তা স্বল্প খরচে কার্যকর মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবেন। এতে উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে কোনো ধরনের সংকট বা চাহিদা কমে গেলে দেশের বৈদেশিক আয় ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করা হয়েছে, যার লক্ষ্য অপ্রচলিত রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করা।
পাট, চামড়া এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের উদ্যোক্তারা এই সুবিধার আওতায় অর্থায়ন পাবেন। বিশেষ করে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে পোশাকশিল্পের পাশাপাশি বিকল্প খাতগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। নতুন তহবিল সেই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে পরিবেশবান্ধব শিল্প ও কারখানার জন্য। এক হাজার কোটি টাকার এই তহবিল থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা ভবন নির্মাণে অর্থায়ন করা হবে।
বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে টেকসই উৎপাদন ও সবুজ শিল্পের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও পরিবেশগত মানদণ্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে এই তহবিল দেশের শিল্প খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চারটি তহবিলের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো ২ থেকে ৪ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। পরে তারা গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারবে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এটি তুলনামূলকভাবে স্বল্প ব্যয়ের অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তহবিল গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়া এবং নিয়মিত তদারকি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে এবার কার্যকর নজরদারি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তহবিল ব্যবহারের ওপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হবে। কোনো ব্যাংক বা গ্রাহক অনিয়ম করলে কিংবা ভুল তথ্য দিলে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, রপ্তানি এবং সবুজ শিল্প—এই চারটি খাতে একযোগে স্বল্পসুদে অর্থায়ন দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে অর্থায়নের সুষ্ঠু বণ্টন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কঠোর তদারকির ওপর।

