প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করতে নতুন সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো প্রবাসীরা অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের ‘অনিবাসী বিনিময়যোগ্য টাকা হিসাব’ খুলতে পারবেন। এই হিসাবের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে জমা থাকা অর্থ ও অর্জিত মুনাফা যেকোনো সময় বিদেশে ফেরত নেওয়া যাবে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় প্রবাসীরা সঞ্চয়ী, চলতি কিংবা মেয়াদি আমানত—সব ধরনের হিসাব খুলতে পারবেন। বৈধভাবে দেশে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে এসব হিসাব পরিচালিত হবে। ফলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা আরও নমনীয় ও বিনিয়োগবান্ধব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই হিসাবে রেমিট্যান্সের অর্থ ছাড়াও অন্য অনিবাসী হিসাব থেকে স্থানান্তরিত টাকা, জমার ওপর অর্জিত সুদ বা মুনাফা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আয় এবং অনুমোদিত বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমা রাখা যাবে। অর্থাৎ প্রবাসীদের জন্য এটি শুধু সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়, বরং একটি সমন্বিত বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করবে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থ প্রত্যাবাসনের সুবিধা। সাধারণত অনেক বিনিয়োগ বা আমানতের ক্ষেত্রে অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে নানা শর্ত থাকে। কিন্তু নতুন এই হিসাবে জমাকৃত মূলধন ও মুনাফা সম্পূর্ণ প্রত্যাবাসনযোগ্য হওয়ায় প্রবাসীরা প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে নিতে পারবেন। এতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের আস্থা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু অর্থ দেশে আনা নয়, এই হিসাবের টাকা দেশের বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতেও ব্যবহার করা যাবে। প্রবাসীরা চাইলে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে এ অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে অন্য বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে রূপান্তরের সুযোগও থাকবে।
নতুন নীতিমালায় শিল্পখাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রাখা হয়েছে। এই হিসাবের অর্থ ব্যবহার করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং অন্যান্য অনুমোদিত শিল্পাঞ্চলের নির্দিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়া যাবে। তবে সেই ঋণ কেবল বেতন, মজুরি, ইউটিলিটি বিলসহ দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে এবং রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে তা পরিশোধ করতে হবে।
এছাড়া প্রবাসীরা নিজেদের হিসাবের স্থিতি জামানত হিসেবে ব্যবহার করে দেশের ব্যাংক থেকে ঋণও নিতে পারবেন। নিজের নামে অথবা মনোনীত ব্যক্তির নামে নেওয়া এই ঋণ ব্যক্তিগত কিংবা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে কৃষি, প্ল্যান্টেশন বা আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসীদের জন্য আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিং সুবিধার দাবি ছিল। নতুন এই ব্যবস্থা রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও উৎসাহিত করবে এবং প্রবাসীদের সঞ্চিত অর্থ দেশের অর্থনীতি, পুঁজিবাজার ও শিল্পখাতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তাদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য অর্থ দেশে আনা ও প্রয়োজনে বিদেশে ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগে আগ্রহও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘অনিবাসী বিনিময়যোগ্য টাকা হিসাব’ প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি যুগান্তকারী ব্যাংকিং সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

