বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এই অর্থায়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ গত ২৪ জুন ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ অনুমোদন করে। রোববার সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
কোন খাতে ব্যয় হবে অর্থ? এই প্রকল্পের আওতায় আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বাড়ানো, আধুনিক আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জরুরি তারল্য সহায়তা (Emergency Liquidity Assistance) কাঠামো প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক পুনর্গঠনের কৌশল প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কারে সহায়তা দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং আর্থিক খাতের নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা খাতটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিতে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক খাত প্রয়োজন। কিন্তু দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ ধারণকারী ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমানে উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে রয়েছে।
তার মতে, নতুন প্রকল্পটি ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার ও বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর বিশেষজ্ঞ তোশিয়াকি ওনো জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তার মতে, এ উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করবে এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু অর্থায়ন নয়, এই প্রকল্পের মূল গুরুত্ব রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে। কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

