দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) অর্থায়নে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে ব্র্যাক ব্যাংক।
ব্যাংকটির দাবি, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং জামানতবিহীন ঋণ বিতরণে সফলতার কারণে সরকারি বিশেষ তহবিল কার্যকরভাবে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা তাদেরই সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা এবং ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তা খাতকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ব্যাংকটি।
এক সাক্ষাৎকারে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ব্যাংকটির লক্ষ্য ছিল প্রথাগত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গত ২৫ বছরে দেশের দুই হাজার ৩০০টিরও বেশি স্থানে সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও সহজে ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি জানান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ এবং সেই ঋণের অর্থ পুনরুদ্ধারে ব্র্যাক ব্যাংক উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এ অভিজ্ঞতার কারণে সরকারি বিশেষ তহবিল ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাংকটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তাদের বিশ্বাস।
জামানতবিহীন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ সিএমএসএমই উদ্যোক্তাকে মোট দুই লাখ কোটি টাকার অর্থায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ ঋণই কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ব্যবসার বাস্তব অবস্থা মূল্যায়ন এবং সময়োপযোগী নতুন ঋণপণ্য চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাংকটির ৩১৫টি শাখা ও উপশাখা এবং ৪৪৬টি এসএমই ইউনিট অফিস পরিচালিত হচ্ছে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে প্রত্যন্ত এলাকার উদ্যোক্তাদের কাছেও দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে তিনি ব্যাংকিং লেনদেনের ইতিহাস না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। অনেক নতুন উদ্যোক্তার আনুষ্ঠানিক আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য না থাকায় তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানে ব্যাংকটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের নিয়মিত লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের ঋণ পাওয়া সহজ হয়।
সরকার গ্রাহক পর্যায়ে স্বল্প সুদে অর্থায়নের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখছেন না বলে জানান তিনি। তার মতে, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে কম সুদে অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করায় ব্যাংকটির একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা কম খরচে অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হবে।
নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ লক্ষ্যে ‘তারা’ নামে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, নারী উদ্যোক্তাদের দেওয়া ঋণের প্রায় ৯৬ শতাংশই জামানতবিহীন। ব্যবসা শুরু করার মাত্র এক বছর পর থেকেই একজন নারী উদ্যোক্তা ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং পণ্য বাজারজাতের জন্য বিশেষ মেলারও আয়োজন করা হচ্ছে।
নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও নিজেদের অবদানের কথা তুলে ধরেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক। শুধু গত এক বছরেই তিন হাজার ৬০০ নারীকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এবং দেড় লাখ নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা সম্প্রসারণে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উদ্যোক্তাদের নতুন ব্যবসায়িক ধারণা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে ‘এসএমই ইনোভেশন ল্যাব’ পরিচালনা করা হচ্ছে।
তারেক রেফাত উল্লাহ খানের মতে, সরকারের নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে ব্র্যাক ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে ৩০ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সরকারি লক্ষ্যের বড় একটি অংশ বাস্তবায়নে ব্যাংকটি এককভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশে সিএমএসএমই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখনও সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। তাই ব্যাংকগুলো যদি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, জামানতবিহীন ঋণ, আর্থিক শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে পারে, তাহলে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।

