উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই তহবিলের আওতায় কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকেরা বিভিন্ন খাতে সর্বোচ্চ ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, উত্তরবঙ্গে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হলেও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজারজাতকরণ অবকাঠামো, বিশেষায়িত হিমাগার এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সীমাবদ্ধতার কারণে অঞ্চলটির প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে কৃষি মূল্যশৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতেই এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তহবিলটির মেয়াদ হবে তিন বছর। দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে এ তহবিল পরিচালিত হবে এবং নির্ধারিত চারটি অগ্রাধিকার খাতে অর্থায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং রপ্তানিকেও একই অর্থায়ন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
তহবিলের ১৫ শতাংশ অর্থ কৃষি উৎপাদন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই খাতে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
অন্যদিকে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন খাতের জন্য মোট তহবিলের ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একইভাবে কৃষিজাত ও কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্যও আরও ৩৫ শতাংশ অর্থ সংরক্ষিত থাকবে। এই দুই খাতেই একজন উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবে। ফলে আধুনিক হিমাগার নির্মাণ, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কৃষিভিত্তিক কারখানা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে বড় বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়া তহবিলের অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ অর্থ কৃষিপণ্য ও কৃষিভিত্তিক পণ্যের রপ্তানি খাতে ব্যয় করা হবে। এই খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির সুযোগও তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারে আরও জানিয়েছে, গ্রাহকের প্রকৃত অর্থায়নের প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যাংকগুলো নির্ধারিত ঋণসীমা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বা কমাতে পারবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিয়ে খাতভিত্তিক বরাদ্দের হারও পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তহবিল পরিচালনা সহজ হবে।
এই বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদ বা মুনাফা হারে অর্থ পাবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফা হারে ঋণ বিতরণ করা যাবে। এর ফলে তুলনামূলক কম খরচে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ঋণের মেয়াদও খাতভেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন খাতের ঋণের ক্ষেত্রে তিন মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৮ মাস সময় পাওয়া যাবে। অন্যদিকে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানি খাতের ঋণের জন্য তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরবঙ্গ দেশের অন্যতম প্রধান কৃষি উৎপাদন অঞ্চল হলেও উৎপাদনের পর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত সুবিধার ঘাটতির কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয় এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। নতুন এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়বে, কৃষিভিত্তিক শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এছাড়া কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং রপ্তানি—পুরো মূল্যশৃঙ্খলে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

