বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্যচাপ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একসঙ্গে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়া, ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা এবং দুর্বল তদারকির ফল এখন ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এসব ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। মার্চের আগের অবস্থানের তুলনায় এই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ সমস্যাটি এখন আর কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশের আর্থিক ভিত্তিই চাপের মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকের মূলধন হলো সম্ভাব্য লোকসান সামাল দেওয়ার অন্যতম প্রধান নিরাপত্তাবলয়। সেই মূলধন যখন বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়ে, তখন আমানতকারী থেকে শুরু করে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক এবং নতুন প্রজন্মের কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে। ২০২৬ সালের মার্চে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে হয়েছে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নয়টি চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত এক বছরে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
ঋণের বিপরীতে আমানতের অবস্থাও সংকটের গভীরতা বোঝাচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ দশমিক ৩ শতাংশে। চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই অনুপাত ১০১ দশমিক ৬ শতাংশ। সহজভাবে বললে, এসব ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ তাদের সংগৃহীত আমানতের তুলনায় বেশি। ফলে নিজেদের কার্যক্রম চালাতে তাদের অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
এখানেই খেলাপি ঋণ থেকে তারল্য সংকট এবং সেখান থেকে মূলধন সংকটে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের অর্থ আটকে যায়। অর্থের প্রবাহ কমে গেলে আমানতকারীদের চাহিদা পূরণে চাপ তৈরি হয়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জরুরি তারল্য সহায়তা নিতে হয়। এই সহায়তা সাময়িকভাবে ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু ব্যাংকের মূল আর্থিক দুর্বলতা দূর করতে পারে না।
কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক ইতিমধ্যে আমানতকারীদের টাকা তোলার চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা নিয়েছে। এতে তাৎক্ষণিক সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংককে সুস্থ করতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
এই সংকট অবশ্য এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তি এবং ব্যাংকের প্রভাবশালী মালিকদের বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার আগে যথেষ্ট যাচাই, পর্যাপ্ত জামানত এবং ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধক্ষমতা বিবেচনা করা হয়নি বলে প্রশ্ন উঠেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতা। কোনো ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বারবার পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণকে সাময়িকভাবে নিয়মিত দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো দেখালেও প্রকৃত সমস্যা থেকে গেছে আগের জায়গাতেই।
অর্থাৎ সমস্যা সমাধান হয়নি, শুধু পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এখন সেই চাপ একসঙ্গে সামনে আসছে।
দেশের অন্যতম বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অবস্থাও এই সংকটের একটি বড় উদাহরণ। ২০২৬ সালের মার্চে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
ব্যাংকটির ওপর আমানত তুলে নেওয়ার চাপও তৈরি হয়েছিল এবং সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিতে হয়েছে। একটি ব্যাংকের ঋণ সংকট কীভাবে দ্রুত তারল্য সংকটে রূপ নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি তারই স্পষ্ট উদাহরণ।
মূলধন ঘাটতির চিত্রও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ঘাটতিতে থাকা ২৪টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং ১৮টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে।
এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা, ইউসিবির ৫ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৫ হাজার ৮২১ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। এনআরবিসি ব্যাংকের ঘাটতি ৩১৬ কোটি টাকা এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ২৫৪ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যান শুধু হিসাবের খাতায় থাকা কয়েকটি সংখ্যা নয়। মূলধন ঘাটতি মানে ব্যাংকের হাতে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক নিরাপত্তা নেই। ফলে বড় অঙ্কের ঋণ আদায় না হলে বা সম্পদের প্রকৃত মূল্য কমে গেলে ব্যাংকের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—ব্যাংকের হিসাবের সম্পদ হিসেবে দেখানো অর্থের কতটা বাস্তবে আদায়যোগ্য?
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের গুণগত মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পর আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। তবে এই পতনকে ব্যাংক খাতের সুস্থ হয়ে ওঠার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ঋণ শ্রেণিকরণে কঠোরতা, আগে আড়ালে থাকা ক্ষতি প্রকাশ পাওয়া এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে ব্যাংক খাত এখনো গভীর চাপের মধ্যে রয়েছে।
এর সঙ্গে দেশের বাইরে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া বা দুর্বল জামানতের বিপরীতে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে বিদেশে সম্পদ গড়েছেন—এমন অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বেআইনি অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং দেশে ফেরানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
ব্যাংক খাতের এই সংকট মোকাবিলায় নতুন ব্যাংক পুনর্গঠন আইন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আগের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতা দিয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, সম্পদ ও দায় পুনর্বিন্যাস, পরিচালনা পর্ষদ সরিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কোনো ব্যাংককে সুশৃঙ্খলভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ এখন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। পাশাপাশি নয়টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এটি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখতে তারল্য সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল এবং বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেওয়ার প্রবণতা ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেও সংকট দূর হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার আকার আরও বড় হয়েছে।
এখন তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—ব্যাংককে বাঁচানো হবে, নাকি ব্যাংককে ব্যবহার করে যারা সুবিধা নিয়েছে তাদের রক্ষা করা হবে?
দুটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আমানতকারীদের স্বার্থ। কারণ ব্যাংকের মূল অর্থ আসে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় থেকে। কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, কোটি মানুষের আমানতই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি।
বর্তমানে নতুন আমানত সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় একজন আমানতকারীর সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যাংকে রাখে, তাদের জন্য এই সুরক্ষা সীমিত। ফলে কোনো ব্যাংক নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হলে বড় আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আতঙ্ক খুব দ্রুত ছড়াতে পারে। একটি ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা তোলার জন্য ছুটলে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকরাও নিজেদের অর্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন। এভাবে একটি ব্যাংকের সমস্যা ধীরে ধীরে পুরো ব্যাংক খাতের আস্থার সংকটে পরিণত হতে পারে।
এই কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান পদক্ষেপ শুধু কয়েকটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বা পুনর্গঠনের বিষয় নয়। এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ধরে রাখারও পরীক্ষা।
তবে সংকট সমাধানের নামে নির্বিচারে সরকারি অর্থ ঢেলে দেওয়াও সমাধান নয়। আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কোনো শর্ত ছাড়া বারবার দুর্বল ব্যাংককে অর্থ দেওয়া হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হবে।
কারণ তখন ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হতে পারে যে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই ক্ষতি সামাল দেবে।
তাই এখন প্রয়োজন ক্ষতি স্বীকার করা, অর্থ উদ্ধার করা এবং কাঠামোগত সংস্কার করা।
বড় খেলাপি ঋণ আদায়ে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, কর কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে নিজেদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করতে হবে। বিদেশে অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্পদ শনাক্ত ও ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি। ব্যাংক কোনো সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়। এর অর্থের বড় অংশ সাধারণ মানুষের সঞ্চয়। তাই ব্যাংকের মালিকানা পাওয়া কোনো ব্যক্তিগত অধিকার নয়; এটি একটি বড় ধরনের জনস্বার্থের দায়িত্ব।
পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, মালিক ও পরিচালকদের যোগ্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা, বড় ঋণের সীমা, মালিকানার স্বচ্ছতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যাংক যেন প্রভাবশালী মালিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত অর্থের ভাণ্ডারে পরিণত না হয়।
৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি, মূলধন ঘাটতিতে থাকা ২৪টি ব্যাংক, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ এবং ইসলামী ব্যাংকের একার প্রায় ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকার শ্রেণিকৃত ঋণ—এসব সংখ্যা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতির চিত্র নয়।
এগুলো বহু বছরের দুর্বলতা, অনিয়ম, ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং তদারকির ঘাটতির জমে থাকা ফল।
এখন আর সামান্য সংস্কার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সময় নেই। প্রয়োজন ব্যাংক খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার। প্রকৃত ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যত টেকসই নয়, তাদেরও অনির্দিষ্টকাল কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার পরিবর্তে সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্গঠন বা অবসানের ব্যবস্থা করতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের শক্তি শুধু তার সম্পদের পরিমাণে নয়, মানুষের আস্থায়।
একজন সাধারণ মানুষ যখন জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখেন, তখন তার একটাই প্রত্যাশা থাকে—প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তিনি ফেরত পাবেন। সেই বিশ্বাস যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি অর্থসহায়তা দিয়েও পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে পথ দুটি—পুরোনো অনিয়ম, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা ও বারবার উদ্ধার করার সংস্কৃতি চালিয়ে যাওয়া, অথবা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত শক্ত করা।
ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে হলে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে হবে মানুষের আস্থা।

