বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমনিতেই বিপুল খেলাপি ঋণ আর নিস্তেজ ঋণচাহিদার চাপে ধুঁকছে, তার ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গভীর সংকট—ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আইনি লড়াই। ইনল্যান্ড বিল পারচেজ সুবিধা এবং ঋণপত্র বা এলসির গ্যারান্টি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের পারস্পরিক বিরোধের জেরে দেশের অর্থঋণ আদালতগুলোতে আটকে আছে বারো হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান শুধু আইনি জটিলতা নয়, বরং ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যকার আস্থার সংকটেরও একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
এমনই একটি দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ চলছে দুটি ব্যাংকের মধ্যে, যার শিকড় প্রায় দুই যুগ আগের। ২০০২ সালে চট্টগ্রামের একটি তামাক কোম্পানির ইস্যু করা সাতান্নটি পোস্ট-ডেটেড চেককে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত। চট্টগ্রামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই চেকগুলো একটি ব্যাংকে জমা দিয়ে ইনল্যান্ড বিল পারচেজ সুবিধা নেয়। চেকগুলো ছিল আরেকটি ব্যাংকের হিসাবের ওপর ইস্যু করা, আর সেই ব্যাংক প্রতিটি চেকে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়েছিল এবং পরে লিখিতভাবে তা পুনরায় নিশ্চিতও করেছিল।
এই নিশ্চয়তার ভিত্তিতে প্রথম ব্যাংকটি প্রায় সাড়ে পনেরো কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেয় ওই প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু চেকগুলো উপস্থাপনের সময় সবগুলোই ডিজঅনার হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় দায় নিয়ে দুই ব্যাংকের মধ্যে দীর্ঘ আইনি লড়াই—একপক্ষের দাবি, নিশ্চয়তা দেওয়া ব্যাংকই দায়ী; অন্যপক্ষের যুক্তি, দায় বর্তায় মূল গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের ওপর। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে প্রায় আঠারো কোটি টাকা আদায়ের দাবিতে ঢাকার একটি অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
মামলাটিতে ২০০৬ সালে বিবাদী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডিক্রি হলেও সেই রায় চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়, যা খারিজ হয়ে যায়। পরে আপিল বিভাগেও একই রায় বহাল থাকে গত বছরের আগস্টে। কিন্তু এত বছর পরও অর্থঋণ আদালত সেই ডিক্রি কার্যকর করতে না পারায় বিজয়ী ব্যাংকটি এখনো তাদের পাওনা অর্থ বুঝে পায়নি।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের আন্তঃব্যাংক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক সালিশি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকে, যা বাংলাদেশেও অনুসরণযোগ্য বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি তিনি প্রস্তাব দেন, কোনো ব্যাংকের কারণে এ ধরনের বিরোধ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
সর্বোচ্চ আদালত ও বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সারা দেশে এ ধরনের প্রায় সাড়ে সাত হাজার মামলা বিচারাধীন, যেখানে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় বারো হাজার কোটি টাকা। শুধু রাজধানীর চারটি অর্থঋণ আদালতেই বিচারাধীন রয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মামলা, যেখানে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।
বছরওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের করা মামলার সংখ্যা প্রায় ছয়শোর কাছাকাছি, যেখানে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। আগের কয়েক বছরের তুলনায় দেখা যায়, প্রতিবছরই এমন মামলার সংখ্যা ও জড়িত অর্থের পরিমাণ ওঠানামা করলেও সার্বিক প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখীই থেকেছে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মামলার সংখ্যা বাড়লেও নিষ্পত্তির হার একেবারেই কম। সর্বোচ্চ আদালতের তথ্য বলছে, গত বছর এ ধরনের মাত্র কয়েক ডজন মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে জড়িত অর্থের পরিমাণ মোট আটকে থাকা অর্থের তুলনায় একেবারেই সামান্য।
ইনল্যান্ড বিল পারচেজ মূলত একটি বাণিজ্যিক ঋণ সুবিধা, যার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ এলসি বা বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে পণ্য সরবরাহের পরপরই সরবরাহকারীকে নগদ বা আগাম অর্থ পরিশোধ করা হয়। একজন ব্যাংকিং ও কোম্পানি আইনবিশেষজ্ঞ জানান, অর্থঋণ আদালত আইনে এই ধরনের আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সৃষ্ট দায়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এলসি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, আর এতে একটি ব্যাংককে অন্য ব্যাংকের জন্য জামিনদার হতে হয়। জামিনদার ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে অর্থ আদায়ে মামলা দায়ের করে অপর ব্যাংক। এ ছাড়া লিখিত ক্ষতিপূরণ বা ইনডেমনিটির ভিত্তিতেও এমন মামলা হতে পারে বলে জানান তিনি।
এই আইনের অধীনে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের প্রথম মামলাটি হয়েছিল আরও আগে, একটি বস্ত্র প্রতিষ্ঠানের তুলা আমদানির এলসিকে কেন্দ্র করে। ইস্যুকারী ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করায় নেগোশিয়েটিং ব্যাংক আদালতের শরণাপন্ন হয় এবং শেষ পর্যন্ত রায় পেয়ে অর্থ আদায় করতে সক্ষম হয়। সংশ্লিষ্ট এক আইনজীবীর ভাষ্যে, এটিই ছিল অর্থঋণ আদালত আইন প্রণয়নের পর দেশের ইতিহাসে এই ধরনের প্রথম মামলা।
এরপর একাধিক ব্যাংক একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে আমদানি এলসির গ্যারান্টি নিয়ে বিরোধের জেরে—কোনোটিতে দাবির পরিমাণ আট কোটি টাকা, কোনোটিতে নয় কোটি টাকা। এসব মামলার বেশির ভাগই এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক মুখপাত্র জানান, ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দেশে সালিশি আইন বিদ্যমান। তাঁর মতে, এলসি নিয়ে এ ধরনের বিরোধ মাঝেমধ্যে তৈরি হলেও শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধেই যে মামলা হয়, বিষয়টিকে সেভাবে দেখা ঠিক নয়—মূল লেনদেনের সঙ্গে জড়িত পক্ষকেও মামলায় বিবাদী করা হয়। তিনি জানান, বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে, তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, আন্তঃব্যাংক এই আইনি লড়াই শুধু আটকে থাকা অর্থের অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারও একটি বড় প্রমাণ। যেখানে ব্যাংকগুলো একে অপরের ওপর ভরসা রেখে বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পন্ন করে, সেখানে বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত বিরোধ পুরো ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার অভাব—এই দুই কারণেই সমস্যাটি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের প্রস্তাব, দ্রুত সালিশি ব্যবস্থা চালু ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি ছাড়া এই সংকট কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

