বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের অনুমোদিত প্রায় এক হাজার দুইশ কোটি ডলারের প্রকল্প ঋণের একটি বড় অংশ এখনো ব্যবহারই করা যায়নি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাবে আটশ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক ধারণা তৈরি থেকে শুরু করে মূল্যায়ন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং সবশেষে প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড়—এই পুরো যাত্রা সম্পন্ন করতেই লেগে যাচ্ছে প্রায় এক বছর সময়।
কেবল প্রথম কিস্তির অর্থ হাতে পেতেই রেয়াতকালের এক বছর বা তারও বেশি সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সাধারণত এ ধরনের ঋণ চুক্তিতে তিন থেকে পাঁচ বছরের রেয়াতকাল রাখা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ বলছে, পর্ষদের অনুমোদনের পর অর্থায়ন চুক্তি সইয়ে গড়ে সাড়ে চার মাস সময় লাগছে। চুক্তি কার্যকর হতে যোগ হচ্ছে আরও দুই মাসের বেশি সময়, আর প্রথম কিস্তি ছাড়ে দরকার হচ্ছে আরও পাঁচ মাসের বেশি। সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে প্রায় বারো মাসের কাছাকাছি।
এই বিশ্লেষণে যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, তার বেশিরভাগই পুরোনো ও পরিচিত। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজে ঘাটতি থাকায় প্রায়ই তৈরি হচ্ছে অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ নকশা। এর ফলে প্রকল্প প্রস্তাবের সঙ্গে মূল্যায়ন নথির মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিচ্ছে নিয়মিতই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বারবার প্রকল্প পরিচালক বদল, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্বের মতো পুরোনো সমস্যাগুলোও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত এসব বাধা চিহ্নিত করা গেলেও একটি মৌলিক প্রশ্নের জবাব এখনো অধরা—এসবের দায় আসলে কার? প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে ঘন ঘন কর্মী রদবদল ও দীর্ঘায়িত বাস্তবায়নের মূল কারণ খুঁজে বের করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক একজন প্রধান অর্থনীতিবিদ এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, প্রশাসনিক কাঠামোর মূল দুর্বলতাগুলো সরাসরি সমাধান না করা হলে সংস্কারের যেকোনো আহ্বান কেবল কথার কথা হয়েই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গত জুলাই মাসে ঢাকায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কার্যালয়ে বিশ্বব্যাংক-অর্থায়িত প্রকল্পের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সমস্যা, অর্থ ছাড়ের গতি এবং প্রকল্প প্রস্তুতি নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় এই মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি উপস্থাপিত হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান ৩৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টিই এখন মারাত্মক বাস্তবায়ন সংকটে। এ ছাড়া প্রায় একশ চল্লিশ কোটি ডলারের আরও চারটি প্রকল্প এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে আছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ নকশার ভিত্তিতে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছালেই আসল সমস্যা প্রকাশ পায়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে অনুমোদিত নকশার মিল না থাকায় বারবার সংশোধন করতে হয়, যাতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। মূল কারণ হিসেবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতাকেই দায়ী করা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাব, মূল্যায়ন নথি এবং অর্থায়ন চুক্তির মধ্যে তথ্যের অসামঞ্জস্যও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।
অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক ঘন ঘন বদল এবং সময়মতো জনবল নিয়োগ না হওয়ায় কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব যুক্ত হয়ে সামগ্রিক বাস্তবায়নকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ডিজিটাল প্রস্তুতি ও অনলাইন সেবা আধুনিকায়নের একটি প্রকল্পও একই ধরনের সমস্যায় জর্জরিত, যার ফলে নির্ধারিত সময়সীমা এখন ঝুঁকির মুখে।
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকগুলোতেও তথ্যের ঘাটতি স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সম্পর্কে কমিটির পূর্ণাঙ্গ ধারণা না থাকায় জনবল কাঠামো ও ব্যয় প্রাক্কলন নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় কারিগরি দল ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি থেকেই যায়, অথচ এই অসম্পূর্ণ দলিলের ভিত্তিতেই দ্রুত ঋণ আলোচনা শুরু করে দেওয়া হয়—যা পরে সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিখিত নথি ছাড়াই কেবল মৌখিক আলোচনার ভিত্তিতে চুক্তি সই করার নজিরও পাওয়া গেছে। একটি ডিজিটাল স্বচ্ছতা প্রকল্পের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটার পর পরবর্তীতে বৈঠকের কার্যবিবরণী প্রকাশ পেলে তাতে বেশ কিছু অবাস্তব শর্তের উপস্থিতি ধরা পড়ে। একইভাবে রাজধানীর একটি মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রকল্পের আলোচনাও মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ায় পরবর্তী ধাপে প্রকল্পটি পুরোপুরি থমকে যায়।
কর্মকর্তারা আরও জানান, বিশ্বব্যাংক থেকে চূড়ান্ত নথি হাতে পাওয়া এবং মূল আলোচনার তারিখের মধ্যে সময় এতই কম থাকে যে সেগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনার সুযোগই মেলে না। অসম্পূর্ণ নথির ভিত্তিতে আলোচনা শুরুর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো বায়ুদূষণ প্রতিরোধ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প। এমনকি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনের আগেই ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্পন্ন করার প্রবণতাও কয়েকটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ধরা পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি আঞ্চলিক জলপথ পরিবহন প্রকল্প ও একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য সংযোগ কর্মসূচি।
প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত পার্থক্যও উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের পর্ষদে অনুমোদিত প্রতিটি প্রকল্পকেই সক্রিয় হিসেবে গণনা করে, অথচ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কেবল সেই প্রকল্পগুলোকেই সক্রিয় ধরে যেগুলোর অর্থায়ন চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়েছে। এই পদ্ধতিগত ভিন্নতার কারণে অব্যবহৃত অর্থের প্রকৃত চিত্র নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ও জ্বালানি খাত নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—দুটিই পর্ষদে অনুমোদিত হলেও চুক্তি সই না হওয়ায় পুরো অর্থই কাগজে-কলমে অব্যবহৃত দেখাচ্ছে। প্রথমটির জন্য প্রায় ২৯ কোটি ডলার এবং দ্বিতীয়টির জন্য সাড়ে ৩৫ কোটি ডলার বরাদ্দ রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তুতির সময়সীমার সঙ্গে পর্ষদ অনুমোদনের সূচি সমন্বয় করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর ফলে চারটি প্রকল্পেই আটকে আছে প্রায় একশ সাতান্ন কোটি ডলার, যার মধ্যে রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংক্রান্ত একটি প্রকল্প, একটি সমুদ্রবন্দর প্রকল্প, ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প এবং একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর কর্মসূচি।
এর বাইরে অনুমোদিত ও সইকৃত প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতেই লাগছে এক থেকে দুই বছর। সড়ক নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ বিতরণ আধুনিকায়ন সংক্রান্ত প্রকল্পসহ চারটি বড় প্রকল্পে কেবল কার্যকর হতে দেরি হওয়ার কারণেই নতুন করে প্রায় একশ বত্রিশ কোটি ডলার অব্যবহৃত তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সহায়তা ও করোনা মহামারি মোকাবিলা সংক্রান্ত দুটি প্রকল্পে যথাযথ কারণ ছাড়াই মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে টেকসই পুনরুদ্ধার ও দুর্যোগ প্রস্তুতি সংক্রান্ত একটি প্রকল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোগ পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত আরেকটি প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই বাড়তি অর্থায়নের আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নকশাগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে শত শত কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা কার্যত অলস পড়ে থাকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়—দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এই দীর্ঘসূত্রতা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন অংশীদারিত্ব থেকে প্রকৃত সুফল পেতে হলে প্রকল্প প্রস্তুতির গুণগত মান বাড়ানো ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

