দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি টানা পাঁচ মাস ধরে পাঁচ শতাংশের ঘরেও উঠতে পারছে না, যা অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি বছরের জুলাই মাসে এই প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে, যেখানে ঠিক আগের মাস জুনে তা নেমে গিয়েছিল সর্বনিম্ন পর্যায়ে, ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। সামান্য এই উন্নতি সত্ত্বেও সামগ্রিক চিত্র এখনো উদ্বেগজনকই থেকে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। কিন্তু জুলাই পর্যন্ত অর্জিত প্রবৃদ্ধি সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে। বছরের শুরু থেকে মাস শেষে প্রবৃদ্ধির ধারা দেখলেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মার্চে ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মে মাসে তা কিছুটা বেড়ে হয় ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। কিন্তু জুনে আবার তা নেমে যায় নতুন সর্বনিম্ন রেকর্ডে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের পর একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল যে দেশে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়বে, যার হাত ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ইরান-সম্পর্কিত যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তোলে, যার ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করছেন।
একটি স্বনামধন্য ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর মতে, নির্বাচনের পর ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা জ্বালানি সংকটজনিত যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভেস্তে গেছে। তবে তিনি আশাবাদী যে আগামী মাসগুলোতে এই প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু হওয়া এই নিম্নমুখী ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে জানাচ্ছেন ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা। এই সময়ে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের বদলে বরং উৎপাদন কমিয়েছে, কিছু বড় শিল্পগোষ্ঠী তাদের কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। যেসব কারখানা এখনো চালু আছে, তাদের একটি বড় অংশও উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের প্রধান বলেন, ব্যাংকঋণ তখনই বাড়ে, যখন বাজারে এর প্রকৃত চাহিদা থাকে। কিন্তু বর্তমানে ব্যবসায়ীদের হাতে নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তাঁর মতে, এর মূল কারণ জ্বালানি সংকট—গ্যাস ও তেলের ঘাটতির কারণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দুর্বল প্রবৃদ্ধির পেছনে চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই সমস্যা কাজ করছে। সরবরাহের দিক থেকে ব্যাংকগুলো এখন ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণের চাপের মুখে রয়েছে, যার কারণে তারা নতুন ঋণ বিতরণে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছে এবং অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছে। অন্যদিকে চাহিদার দিক থেকে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস সংকট ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য করছে।
জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব শিল্প খাতেও স্পষ্ট। পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কোথাও কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, একদিকে ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত সতর্কতা—এই দুটি কারণ মিলেই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে রেখেছে। চলমান জ্বালানি সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, এবং যতদিন এই সংকটের সমাধান না হচ্ছে, ততদিন শিল্প উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগের গতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

