গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা দিতে নতুন ক্রেডিট কার্ড বাজারে এনেছে সিটি ব্যাংক। ‘সিটি ব্যাংক আমেরিকান এক্সপ্রেস আল্ট্রামেরিন ক্রেডিট কার্ড’ নামের এই কার্ডটি জামানত-ভিত্তিক ও জামানত-বিহীন; দুভাবেই পাওয়া যাবে এবং এটি দেশি ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সিটি ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে কার্ডটির উদ্বোধন করা হয়। সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হোসেন খালেদ এবং আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকিং করপোরেশনের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক সার্ভিসেসের পরিচালক কুরুশ দাস্তুর ও সাউথ এশিয়া অঞ্চলের নেটওয়ার্ক পার্টনারশিপসের সিনিয়র ম্যানেজার পুনিত মাথুর যৌথভাবে কার্ডটির উদ্বোধন করেন। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই কার্ডের জন্য আবেদন করা যাবে।
নতুন এই কার্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো প্রথম তিন মাসে নির্দিষ্ট খরচের ওপর ৫ শতাংশ ক্যাশব্যাক, যার সর্বোচ্চ সীমা ১০ হাজার টাকা। বিকল্প হিসেবে গ্রাহকরা ৫ হাজার টাকা মূল্যের ভ্রমণ লাগেজ ভাউচার নিতে পারবেন। ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে থাকছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সিটি ব্যাংক আমেরিকান এক্সপ্রেসের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ লাউঞ্জে সর্বোচ্চ দুজন সঙ্গীসহ বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ। এর বাইরে বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত বিমানবন্দরে বছরে ১২ বার বিনামূল্যে ‘প্রায়োরিটি পাস’ লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা মিলবে। কার্ডধারী ও তার সঙ্গীরা এই ১২টি ভিজিট নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারবেন, যেখানে লাউঞ্জে প্রতিবার প্রবেশকে একটি ভিজিট হিসেবে গণনা করা হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক এটিএম থেকে নগদ টাকা তোলার ক্ষেত্রে কোনো ক্যাশ উইথড্রয়াল ফি দিতে হবে না। শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রাইমারি কার্ডধারী সর্বোচ্চ দুজন অতিথিসহ ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবাও পাবেন।
ভ্রমণের খরচ কমাতে কার্ডটিতে আন্তর্জাতিক বিমান টিকিট এবং দেশের অভ্যন্তরে হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ সাশ্রয়ের সুযোগ থাকছে। গো-জায়ানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক টিকিট কিনলে বিশেষ ভ্রমণ বিমা ও লাগেজ সুবিধা পাওয়া যাবে। কার্ডে প্রতি ১০০ টাকা বা ১ ডলার খরচের বিপরীতে মিলবে ৩টি মেম্বারশিপ রিওয়ার্ডস পয়েন্ট, যা দিয়ে উপহার ভাউচার কেনা, বার্ষিক ফি মওকুফ কিংবা পয়েন্টের সঙ্গে অর্থ মিশিয়ে কেনাকাটার সুবিধা নেওয়া যাবে। এছাড়া সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশের নির্বাচিত আন্তর্জাতিক হোটেলে ‘একটি কিনলে একটি বিনামূল্যে’ বুফে খাবারের সুবিধা থাকছে। সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হোসেন খালেদ বলেছেন, গ্রাহকদের পরিবর্তনশীল চাহিদা মেটাতে উন্নত আর্থিক সেবা দেওয়ার ধারাবাহিকতায় নতুন এই কার্ড আনা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কেনাকাটা ও ভ্রমণে গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা দেবে।
এই কার্ডটি বাজারে আসার সময়টা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। এই বাজারে সিটি ব্যাংক এককভাবে সবচেয়ে বড় কার্ড ইস্যুয়ার; প্রায় ৭ লাখ ২৪ হাজার সক্রিয় কার্ড নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষে রয়েছে। আমেরিকান এক্সপ্রেসের একচেটিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি থাকার কারণেই এই খাতে সিটি ব্যাংকের সুবিধা অনেক বেশি। সিটি ব্যাংক আমেরিকান এক্সপ্রেসের আগের কার্ডগুলো, যেমন প্লাটিনাম রিজার্ভ, গোল্ড ও ব্লু. ইতিমধ্যেই বাজারে জনপ্রিয়। আল্ট্রামেরিন কার্ডটি মূলত জামানত-বিহীন গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে আনা হয়েছে, যা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে আগ্রহী কিন্তু জামানত দিতে অনিচ্ছুক বা অক্ষম, এমন গ্রাহকদের জন্য বড় সুবিধা।
বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ড বাজারে প্রবৃদ্ধির পেছনে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো, বিশেষ করে ইন্টারঅপারেবল কিউআর কোড, পিওএস টার্মিনাল এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে ব্যাংকের সংযোগ বড় ভূমিকা রাখছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থবির আয়ের কারণে গ্রাহকরা ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে ঋণ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সিটি ব্যাংকের আল্ট্রামেরিন কার্ডটি মূলত প্রিমিয়াম গ্রাহকদের লক্ষ্য করে আনা হয়েছে—যারা ভ্রমণ, আন্তর্জাতিক কেনাকাটা ও লাইফস্টাইল সুবিধার জন্য বাড়তি খরচ করতে রাজি। বিদ্যমান সনদপত্র, স্কিম এবং রিওয়ার্ড স্ট্রাকচার তুলনা করে দেখা যায়, আল্ট্রামেরিন কার্ডের ভ্রমণ সুবিধাগুলো প্রতিযোগীদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। তবে উচ্চ বার্ষিক ফি, বিনিময় হার ও রিওয়ার্ড রিডেম্পশনের শর্তাবলী কতটা গ্রাহকবান্ধব হবে, সেটাই নির্ধারণ করবে এই কার্ড কতটা জনপ্রিয়তা পায়।

