বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট; মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনই নীতিগতভাবে বড় স্বস্তির জায়গায় যেতে চাইছে না। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্তটির পেছনে শুধু বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার নয়, সামনে থাকা জ্বালানির দাম, মজুরি বৃদ্ধি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুর্বলতাকেও একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ‘আমার দিন’-এর সম্পাদক আহসান হাবিব বরুনের একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত ভূমিকা ও প্রকাশ্য অবস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সরকারের রাজস্ব বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরাসরি সতর্ক করে, তখন সেটিকে শুধু মুদ্রানীতির একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা যায় না। বরং সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই জায়গায় একটি আইনি পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন যেমন রয়েছে, তেমনি সরকারের সঙ্গে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বিনিময় হার নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অর্থনীতিতে বিভিন্ন সরকারি নীতির প্রভাব সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বও রয়েছে। একই আইনে সরকারের সাধারণ তদারকি ও গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতার কথাও আছে। ফলে ‘স্বাধীনতা’ বলতে এখানে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং নিজস্ব নীতিগত মূল্যায়ন ও মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরকে বোঝানো বেশি যথাযথ।
এবার সংখ্যার দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুযায়ী, আগস্টে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশের তুলনায় কম এবং ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারে খাবারের দামের চাপ কিছুটা কমলেও বাড়িভাড়া, পরিবহন, বিভিন্ন সেবা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ওপর চাপ এখনো যথেষ্ট উঁচুতে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতির পতনে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ও বেস-ইফেক্ট ভূমিকা রেখেছে; বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যচাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখানেই জ্বালানি তেলের দাম এবং নতুন জাতীয় পে স্কেলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেপ্টেম্বরের শেষভাগে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিন; চার ধরনের প্রধান জ্বালানির দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। জ্বালানি ব্যবহারের ব্যাপকতা বিবেচনায় এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পাম্পে জ্বালানি কেনার সময়েই শেষ হয় না; পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খরচের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও সেপ্টেম্বরের জ্বালানি মূল্য সমন্বয়কে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন জাতীয় পে স্কেলও মুদ্রানীতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভেরিয়েবল। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা নতুন পে স্কেল অনুমোদন করে এবং ১৯ সেপ্টেম্বর এর গেজেট প্রকাশিত হয়। এটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে, তবে বেতন বৃদ্ধির বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বাস্তবায়ন মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের রাজস্ব অবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিষয়টি একটু সূক্ষ্ম: সরকারি কর্মীদের আয় বাড়লে ভোগের সক্ষমতা বাড়তে পারে, যা দুর্বল অর্থনীতিতে চাহিদাকে কিছুটা সহায়তা করতে পারে; কিন্তু সেই অতিরিক্ত ব্যয় যদি সামগ্রিক রাজস্ব ও অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একই নীতির একদিকে প্রবৃদ্ধি ও আয় সমর্থনের সম্ভাবনা আছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক এবার মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধিকে আলাদা দুটি সমস্যা হিসেবে দেখেনি। মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিল্প উৎপাদন দুর্বল, বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ ধীর এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির বিভিন্ন সূচকেও দুর্বলতা আছে। একই সময়ে উচ্চ সুদ, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বাধা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে সতর্ক রয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে এখন এক ধরনের দ্বৈত সমস্যা; একদিকে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিক গতিতে নেই। এই পরিস্থিতিতে সুদহার দ্রুত কমালে ব্যবসা ও বিনিয়োগে কিছু স্বস্তি আসতে পারে, কিন্তু তাতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখলেও প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এবারের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বটি মূলত এই জায়গাতেই।
এখানে আহসান হাবিব বরুনের বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু সুদের হার নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে নীতি-সমন্বয়ের ধরনও এর অংশ। বাস্তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব আইনগত কাঠামোই বলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব মূল্যায়ন করে পরামর্শ দেবে। ফলে কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব তুলে ধরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের বাইরের বিষয় নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই মূল্যায়ন কতটা তথ্যনির্ভর, কতটা প্রকাশ্য এবং নীতিনির্ধারণে তার প্রভাব কতটা কার্যকর। এই জায়গাটিই বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় আগামী দিনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিকে কেবল ‘রেপো রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে রাখা হয়েছে’ এই একটি লাইনে আটকে রাখলে এর তাৎপর্য অনেকটাই হারিয়ে যায়। আগস্টের মূল্যস্ফীতি কমেছে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো উঁচু; জ্বালানির নতুন দাম পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে; জাতীয় পে স্কেলের বাস্তবায়ন রাজস্ব ও চাহিদার ওপর নতুন প্রভাব ফেলতে পারে; আর একই সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও দুর্বল। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অবস্থানকে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া বজায় রেখে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জায়গাটিও খোলা রাখার চেষ্টা হিসেবে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রশ্নে সাম্প্রতিক বিতর্কের গুরুত্ব এখানেই সরকারি নীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রকাশ করতে পারে, সেটাই একটি কার্যকর মুদ্রানীতি কাঠামোর আসল পরীক্ষা।

