বন্ধ কারখানা আবার চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে সেই অর্থ পাওয়া সহজ হচ্ছে না। এ পর্যন্ত ২৫টি প্রতিষ্ঠান ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ চেয়ে আবেদন করেছে। ঋণ পেয়েছে মাত্র তিনটি, মোট ৫০ কোটি টাকা। ব্যাংকের কাছে আবেদন জমা দিতে গিয়ে এবং জমা দেওয়ার পর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা নানা জটিলতায় পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির দাবিতে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গার্মেন্টস, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল ও পাটসহ বিভিন্ন খাতের শীর্ষ সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিল বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বাংলাদেশ চেম্বার অব অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদ ও মো. সরোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বৈঠকে ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিই ছিল আলোচনার মূল বিষয়। এসব কর্মসূচির জন্য জারি করা নীতিমালায় কোনো ঘাটতি বা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি আসল ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের হাতে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ীদের বড় অভিযোগ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা নিয়ে। ঋণের আবেদন অনুমোদনের জন্য পর্ষদের সভা দরকার হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই সভা বসতেই এক মাস পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে। যে কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ, সেখানে এক মাসের অপেক্ষা মানে শ্রমিকদের আরও এক মাস কর্মহীন থাকা, চলমান খরচ বাড়া এবং ক্রেতার কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করার সুযোগ হারানো। সে কারণে ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব দিয়েছেন, প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত অথবা প্রয়োজনে বিশেষ পর্ষদ সভা ডেকে আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি করা হোক।
পর্ষদ সভার দেরির বাইরেও আছে কাগজপত্রের ঝামেলা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আবেদনের সময় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাগজ চাওয়া হচ্ছে। এতে আবেদন প্রস্তুত করতেই সময় চলে যায়। এরপর সিদ্ধান্ত পেতে আবার অপেক্ষা করতে হয়। তাঁরা এই দুই জায়গাতেই প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার দাবি জানিয়েছেন।
আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থানও উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য, প্রণোদনা কর্মসূচির নীতিমালা সফলভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে দ্রুত সহায়তা পান, সে জন্য ব্যাংক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রণোদনার অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে জানানো হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়ার সময়ও ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ গতি বাড়ানোর দাবির পাশাপাশি অর্থের অপব্যবহার ঠেকানোর বিষয়টিও সমানভাবে আলোচনায় ছিল।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তাঁর ভাষ্য, প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা নিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ আছে। কিন্তু অনেক ব্যাংক সহযোগিতা না করায় বহু উদ্যোক্তা আবেদনই করতে পারছেন না। কিছু ব্যাংক আবেদন গ্রহণ করতেই অনীহা দেখাচ্ছে। কেউ কেউ নানা অজুহাত দেখিয়ে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্রেই কিছু জটিলতা রয়েছে। সেগুলো দ্রুত দূর করে ইতোমধ্যে জমা পড়া আবেদনগুলো নিষ্পত্তির দাবি বৈঠকে তোলা হয়েছে। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিষয়টির দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে সংকটের গভীরতা বোঝা যায়। তহবিলের আকার ২০ হাজার কোটি টাকা, অথচ এ পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে মাত্র ৭৫০ কোটি টাকা, যা মোট তহবিলের চার শতাংশেরও কম। তার মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৫০ কোটি টাকা, যা চাওয়া অঙ্কের প্রায় সাত শতাংশ। আবেদনের সংখ্যার হিসাবে ২৫টির মধ্যে তিনটি অনুমোদন পেয়েছে, অর্থাৎ ১২ শতাংশ। এই চিত্র দুটি প্রশ্ন সামনে আনে। এক, এত বড় তহবিল থাকা সত্ত্বেও আবেদনের সংখ্যা এত কম কেন? দুই, যে কয়েকটি আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ কেন এখনো আটকে আছে?
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সত্য হলে প্রথম প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই মেলে। ব্যাংকগুলো আবেদন নিতে অনাগ্রহী হলে বা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করলে অনেকেই আবেদনের ধাপে পৌঁছাতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে আবেদনের কম সংখ্যা চাহিদার অভাব নয়, বরং প্রবেশপথের বাধারই ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর রয়েছে পর্ষদ সভার দীর্ঘসূত্রতা, বাড়তি কাগজপত্র এবং নীতিমালার অস্পষ্টতায়। তবে এসব অভিযোগ ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে এসেছে। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
অন্যদিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সতর্কতাকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। প্রণোদনার অর্থ জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাই বাছাই ছাড়া ঋণ দিলে অর্থ অপাত্রে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই কারণেই অর্থের সঠিক ব্যবহার ও যথাযথ যাচাইয়ের ওপর জোর দিয়েছে। ফলে চ্যালেঞ্জটা দুই দিক সামলানোর। একদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত অর্থ পৌঁছাতে হবে, অন্যদিকে যাচাই-বাছাইয়ের মান ধরে রাখতে হবে। প্রক্রিয়া সহজ করতে গিয়ে স্বচ্ছতা কমে গেলে যেমন ঝুঁকি, তেমনি অতিরিক্ত কড়াকড়িতে সহায়তা বিলম্বিত হলে প্রণোদনার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে পারে।
বন্ধ কারখানা চালু হওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি আয়ের প্রশ্ন। কারখানা যত দিন বন্ধ থাকে, তত দিন শ্রমিকদের আয় বন্ধ থাকে, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয় এবং ব্যাংকের কাছে উদ্যোক্তার দায়ও বাড়তে থাকে। এ কারণে ঋণ অনুমোদনের গতি এ ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময়সূচির সঙ্গেও যুক্ত।
এখন নজর থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে। পরিপত্রের জটিলতা দূর করা, পর্ষদ সভার সময় কমানো এবং আবেদন গ্রহণে ব্যাংকগুলোর অনীহা দূর করার মতো সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়িত হলে তহবিলের অর্থ সত্যিই কারখানা চালুর কাজে লাগতে পারে। তা না হলে ঘোষিত প্রণোদনা কাগজে বড় অঙ্কের থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব সীমিতই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

