ধসে পড়া ব্যাংক খাতকে টেনে তুলতে আগামী কয়েক বছর জনগণের করের অর্থ থেকে বড় অঙ্কের বরাদ্দ লাগতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর হিসাবে এই খরচ প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ জোগাতে হবে পাঁচ থেকে আট বছর ধরে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এত বড় অঙ্কের বিনিময়ে জনগণ কী পাবে এবং লুটপাটের দায় কার ওপর বর্তাবে।
গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটাতে জনগণকেই এক ধরনের জরিমানা দিতে হবে। তিনি জানান, বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা করে লাগবে। পাঁচ বছর ধরে এই অর্থ জোগাতে হলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে তিন লাখ কোটি টাকা। আট বছর লাগলে তা বেড়ে হবে চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বছরে এই ব্যয় বাজেটের প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশের সমান।
অঙ্কটির আকার বোঝাতে গভর্নর নিজেই দুটি তুলনা টেনেছেন। তাঁর ভাষ্য, এই অর্থ দিয়ে প্রতিবছর দুই কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া যেত। অথবা তৈরি করা যেত দুটি পদ্মা সেতু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনসংখ্যার হিসাবে ভাগ করলে মাথাপিছু বোঝা দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার ৪৩২ টাকা।
সংকটের গভীরতা বোঝা যায় খেলাপি ঋণের চিত্রে। দেশে এখন খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আরও উদ্বেগের তথ্য হলো, এই খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই জমা হয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। বিশ্লেষকদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক অর্থ লোপাট হয়েছে। তদারকি সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং সরকারের চাহিদা অনুযায়ী নানা অনিয়মে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে। সরকার বদলালেও এই দায় থেকে কোনো পক্ষই পুরোপুরি মুক্ত নয়, তবে অতীতের মাত্রার সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির তুলনা চলে না, এমন মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে প্রশ্নেও বিকল্প সীমিত। বিশ্বব্যাংকের একটি ঋণ কর্মসূচি অবশ্য চালু আছে। ৪৫ কোটি ডলারের এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতি। কিন্তু ক্ষতি পূরণে সরাসরি কোনো অর্থ এই কর্মসূচি থেকে মিলছে না। ফলে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে টেনে তুলতে করদাতার অর্থই প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। বিশ্বব্যাংকের মতো দাতারা ঋণ দেওয়ার সময় কঠোর শর্ত জুড়ে দেয়। অগ্রগতির হিসাবও চায়। তাহলে সাধারণ মানুষ কোনো শর্ত ও জবাবদিহি ছাড়া কেন নিজের করের টাকা দেবে, এই প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে।
সংস্কারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও সংশয়ের কারণ দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৯ মে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তাতে ব্যাংকের আগের মালিকদের ফের মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। পরে বিএনপি সরকারের আমলে সংসদে পাস হওয়া আইনে নতুন একটি ধারা যুক্ত হয়, যাতে পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ খোলা থাকে। সমালোচকদের দাবি, নির্দিষ্ট একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতেই এই ধারা আনা হয়েছিল। তীব্র সমালোচনা এবং দাতাদের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত ধারাটি বাতিল করা হয়। তবে একবার এমন সুযোগ রাখার চেষ্টা হয়েছিল, এই ঘটনাই সংস্কারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বেসরকারি ব্যাংকে পারিবারিক আধিপত্যও দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই প্রবণতা কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি প্রস্তাব দিয়েছিল। একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা তিন থেকে কমিয়ে দুই করা এবং একজন পরিচালকের টানা মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ছয় বছর করা। কিন্তু জানা যাচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুটি প্রস্তাবই নাকচ করেছে। বিভাগটির অবস্থান হলো, মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে নয় বছর করা যেতে পারে, তবে একই পরিবার থেকে তিনজন পরিচালক রাখার বিদ্যমান নিয়ম বহাল থাকবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান এখানে স্পষ্টভাবে আলাদা।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি আর্থিক খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, অতীতে সরকারগুলো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেই এই বিভাগকে টিকিয়ে রেখেছিল। এখন ক্ষমতায় এসে এই দুই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলে সেটিই হবে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আইএমএফের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় আসছে। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ নামের সেই প্রতিবেদন তৎকালীন সরকারের অপছন্দের কারণে প্রকাশ হয়নি। তাতে আইএমএফ সতর্ক করেছিল যে সমাজের একটি অংশে ঋণ না ফেরানোর প্রবণতা গভীরভাবে গেড়ে বসেছে। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা ধরেই নিয়েছেন, তাঁদের ঋণ শোধে বাধ্য করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা দেশে নেই। ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলে গেছে এসব ঋণগ্রহীতার নিয়ন্ত্রণে। এমনকি মাত্র তিনজন বড় ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলেই একটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সেই ব্যবস্থা যদি আবার ফিরে আসে, তাহলে জনগণের দেওয়া অর্থ পুরোটাই বিফলে যেতে পারে।
ঋণ ও লোপাট হওয়া অর্থ ফেরানোর অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন আছে। সরকারি হিসাবে, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে দেশের ভেতরে আছে ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ। বিদেশে আছে ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার সম্পদ। বিদেশের সম্পদ ফেরানো সময়সাপেক্ষ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। কিন্তু দেশে থাকা সম্পদ উদ্ধার তুলনামূলক সহজ। সেগুলো দ্রুত উদ্ধার করা গেলে ব্যাংক খাত কিছুটা স্বস্তি পেত। শুধু টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণায় সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হবে না। তারা চাইবে দৃশ্যমান অগ্রগতি।
আবার শুধু ক্ষতি পুষিয়ে দিলেই ব্যাংক খাত সবল হয় না। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করেছে। এর সাফল্য নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ওপর। তবে একীভূতকরণই সব সমস্যার সমাধান নয়। এ ক্ষেত্রে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে মালয়েশিয়ার ব্যাংক খাত বড় ধাক্কা খায়। দেশটি খেলাপি ঋণ কিনে সামলানোর জন্য দানাহার্তা নামে একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা গড়ে তোলে। ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগাতে গঠন করা হয় দানামোদাল। বড় প্রতিষ্ঠানের দেনা নতুন করে সাজাতে কাজ করে করপোরেট ঋণ পুনর্গঠন কমিটি। একই সময়ে ৫১টি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে ১০টি ব্যাংকিং গ্রুপে আনা হয়। অর্থাৎ শুধু খারাপ ঋণ সরানো হয়নি, ব্যাংকের মূলধন ও কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়া সংকটের সময় কয়েকটি অদক্ষ ব্যাংক বন্ধ করে দেয়। খেলাপি ঋণ কেনার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে। আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সরকার সাময়িকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের নিশ্চয়তা দেয়।
আরও আগে, ১৯৯০-এর দশকে সুইডেন ব্যাংক সংকট সামলাতে বিশেষ একটি ব্যাংক সহায়তা কর্তৃপক্ষ গঠন করে। কর্তৃপক্ষ সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা যাচাই করে। যেগুলো টিকে থাকার মতো, সেগুলোতে মূলধন জোগানো হয়। যেগুলো বাঁচানো সম্ভব ছিল না, সেগুলো সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। খেলাপি সম্পদ সামলাতে সেকুরাম ও রেত্রিভা নামে আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানও গড়া হয়। সরকার ব্যাংক খাতের অবস্থা ও সহায়তার তথ্য প্রকাশ করেছিল, ফলে জবাবদিহিও ছিল কর্মসূচির অংশ।
এই তিন দেশের অভিজ্ঞতায় একটি মিল স্পষ্ট। একীভূতকরণের পাশাপাশি ঋণ পুনর্গঠন, মূলধন জোগান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই সমন্বিত কাঠামো দৃশ্যমান নয় বলেই উদ্বেগ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের বক্তব্য, ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ প্রয়োজন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু করদাতার অর্থ ব্যয়ের আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কী ফল পাওয়া যাবে, ব্যর্থ হলে দায় কার, এবং আগের লুটপাটের জন্য কে কী শাস্তি পেল। পাশাপাশি পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে অগ্রগতিও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। এসব নিশ্চিত না হলে ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।

