গত শনিবার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বললেন, ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটাতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এর খসড়া প্রস্তাব গত সপ্তাহেই সরকারের কাছে গেছে। এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায় নি, তবে বিলটা যে সাধারণ মানুষের করের টাকায় উঠবে, গভর্নর নিজেই তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সুতরাং ব্যপারটা দাঁড়াচ্ছে, লুট করে নিয়ে গেল একজন, এখন জরিমানা দিচ্ছেন আপনি, আমি। কথাটা উঠেছিল এক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন থেকে। তার বাবা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারছিলেন না, টিউশন ফি দিতেও সমস্যা হয়েছে। গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ওই ব্যাংকগুলোকে টাকা জোগান দিচ্ছে, যাতে গ্রাহকরা নিজের টাকা ফেরত পান। সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কেন জরিমানা দেব। আর এর বিনিময়ে আমরা কী পাব?
৬০ হাজার কোটি টাকা আসলে কতটা বড়
সংখ্যাটা কানে শুনে ঠিক বোঝা যায় না, তাই চলুন একটু অন্যভাবে বোঝার চেস্টা করি। পাঁচ বছর ধরে দিলে মোট খরচ তিন লাখ কোটি টাকা, আট বছর হলে চার লাখ আশি হাজার কোটি। চলতি অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় এই এক বছরের অঙ্কই প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশ। আরও চোখে লাগার মত অন্য একটি তুলনা হলো; এনবিআরের এবারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, আর তার প্রায় এক দশমাংশই যাবে শুধু ব্যাংকের ক্ষত সারাতে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের পুরো বছরের বরাদ্দ প্রায় ৪৯ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ ব্যাংকের এই বার্ষিক বিল তার চেয়েও বড়। মাথাপিছু ধরলে বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। অর্থনীতির সবচেয়ে পুরোনো নিয়মটা এখানে খাটে, যাকে বলে অপরচুনিটি কস্ট। একই টাকা দুবার খরচ করা যায় না, ব্যাংকে ঢাললে হাসপাতাল, স্কুল বা রাস্তার জন্য সেটা আর থাকে না। গভর্নর নিজেই বলেছেন, এই টাকায় বছরে দুই কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডে সহায়তা দেওয়া যেত, কিংবা দুটো পদ্মা সেতু বানানো যেত। এটাও মনে রাখা দরকার যে, দেশে কর আদায় এখন জিডিপির সাত শতাংশেরও কম, যা গভর্নর নিজেই স্বীকার করেছেন। হাত তাই খুব ফাঁকা।
ফুটো বালতিতে পানি ঢালার আগে একটা প্রশ্ন
যে প্রশ্নটা আমাকে সবচেয়ে ভাবায়; বালতির তলার ফুটো কি বন্ধ হয়েছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সহজ করে বললে, ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৩৩ টাকাই ফেরত আসছে না। আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ তথ্য মেলালে খেলাপির হারে এখন আমরা বিশ্বে শীর্ষে, আমাদের পরে আছে চাদ, যাদের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। আরও অস্বস্তিকর তথ্য হলো, মার্চ শেষে এই অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খাতায় খেলাপি বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর যে পাঁচ ইসলামী ব্যাংক মিলিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হলো, তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশই খেলাপি, অঙ্কে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এখানে বিশ্বাসযোগ্য একটা ঝুঁকির কথা বলতেই হয়, যার নাম মোরাল হ্যাজার্ড। ক্ষতি যদি শেষ পর্যন্ত অন্য কেউ মিটিয়ে দেয়, তাহলে ঝুঁকি নেওয়া আর ফাঁকি দেওয়ার প্রলোভন কমে না, বরং বাড়ে। জুনে সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনে একটা ধারা (১৮ক) ঢুকেছিল, যেখানে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সাবেক শেয়ারধারীরা কিছু শর্তে আবার মালিকানা ফেরত চাওয়ার সুযোগ পেতেন। অর্থনীতিবিদ, টিআইবি আর ব্যাংকারদের তুমুল সমালোচনার মুখে, এবং বিশ্বব্যাংকের আপত্তির খবরের মধ্যে, অর্থমন্ত্রী ২৯ জুন সংসদে ধারাটি বাতিলের ঘোষণা দেন। সরকার পিছু হটেছে, এটা ভালো খবর। তবে পিছু হটতে যে চাপ লাগল, সেটাই বলে দেয় নজরদারি কতটা দরকার।
যাঁরা আগে এই পথে হেঁটেছেন, তাঁদের হিসাব কেমন
এই ধরনের সংকট আমরাই প্রথম দেখছি না। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭ সালের সংকটের পর ব্যাংক খাত সামলাতে ১৬৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ওন সরকারি অর্থ ঢেলেছিল। আইএমএফের গবেষকদের হিসাবে এর মোট রাজকোষীয় ব্যয় ছিল জিডিপির প্রায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশ। তবে কোরিয়ার আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সেই টাকার ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১২৩ ট্রিলিয়ন ওন সরকার ফেরত পেয়েছে। কিন্তু মনে রাখুন, সেই হিসাব মেলাতে লেগেছে প্রায় তিন দশক। মালয়েশিয়ার রাজকোষীয় ব্যয় ছিল জিডিপির ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশটি দানাহার্তা নামে একটি আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বানিয়ে ব্যাংকের খারাপ ঋণ কিনে নেয়, এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোর ৫৮ শতাংশ আদায় করে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী বিনিয়োগ করা ৮ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন রিঙ্গিতের বিপরীতে নিট লোকসান ছিল মাত্র ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত। সবচেয়ে মনে রাখার মতো শর্তটা ছিল দানামোদাল নামের মূলধন জোগানের সংস্থাকে ঘিরে। ব্যাংককে নতুন মূলধন পেতে হলে আগে খারাপ ঋণ দানাহার্তার কাছে বেচতে হতো। অর্থাৎ টাকার সঙ্গে ছিল আদায়ের বাধ্যবাধকতা। সুইডেনে প্রাথমিক রাজকোষীয় ব্যয় ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, কিন্তু শেষ হিসাবে করদাতার নিট খরচ নেমে আসে শূন্য থেকে দুই শতাংশের মধ্যে। কারণ, যে ব্যাংকের আর কোনো মূল্য বাকি ছিল না, সেখানে শেয়ারধারীদের টাকা শূন্য হতে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তবে একটা সৎ কথা বলে রাখি, ওই দেশগুলোর সংকটের ধরন আর আমাদের সংকট পুরো এক নয়। আমাদের সমস্যা বেশি করে ঋণ বিতরণের জবাবদিহি আর নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা। তাই তুলনা করে সরাসরি হিসাব মেলানো যাবে না, নীতিটা শুধু শিখে নেওয়া যায়।
নীতিটা আসলে কী বলে
এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মান আছে, যেটা তৈরি করেছে ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড (এফএসবি), জি২০ যার সমর্থক। তাদের মূল কথা হলো, ব্যাংক সংকট এমনভাবে সামলাতে হবে যাতে করদাতারা ক্ষতির মুখে না পড়েন, আর লোকসান আগে বহন করবেন ব্যাংকের মালিক এবং অনিরাপদ ও অবিমা করা পাওনাদাররা, নির্দিষ্ট ক্রম মেনে। এই নীতিতে করদাতার টাকা শেষ ভরসা, প্রথম নয়। এখানেই আমাদের হিসাবটা দেখা দরকার। আদালতের আদেশে দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ হয়েছে, যার মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ৩২৬ কোটির কাছাকাছি আর বিদেশে ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। অঙ্কটা শুনতে বড়, কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড়ের তুলনায় মাত্র প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ, আর গভর্নরের চাওয়া বার্ষিক অঙ্কের মোটে এক বছর তিন মাসের সমান। তার ওপর জব্দ মানেই আদায় নয়, আর বিদেশের সম্পদ ফেরানো সবচেয়ে কঠিন কাজ। গভর্নর অবশ্য বলেছেন, ব্যাংক আর খেলাপিদের আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে নিষ্পত্তির সুযোগ আছে, না হলে ২০২৭ সাল থেকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং এর জন্য দুটি আইন সংশোধন হচ্ছে। এই সময়সীমা সরকার কীভাবে রাখে, সেটাই হবে প্রথম বড় পরীক্ষা।
তাহলে বিনিময়ে আমরা কী চাইব
আমার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলি। আমি মনে করি না, এখন করের টাকা দিতে অস্বীকার করা বাস্তব সমাধান। ব্যাংকে আস্থা ভেঙে পড়লে সাধারণ আমানতকারী একসঙ্গে টাকা তুলতে ছোটেন, তাতে ভালো ব্যাংকও বিপদে পড়ে। অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে এটাই “ব্যাংক রান” নামে পরিচিত। আর বিকল্প উৎসও দেখছি না। বিশ্বব্যাংক জুনেই ৪৫ কোটি ডলার অনুমোদন করেছে, কিন্তু সেটা আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা আর ব্যাংক পুনর্গঠনের ভিত গড়ার জন্য। অর্থাৎ ক্ষতি পূরণের টাকা এটা নয়, আর এর সঙ্গেও সংস্কারের শর্ত জুড়ে আছে। দাতারা যদি শর্ত ছাড়া টাকা না দেন, তাহলে নাগরিকদেরও শর্ত চাওয়ার নৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আছে। আমার হিসাবে সেই শর্ত তিনটি। প্রথমত, লোকসানের দায় আগে যাবে সাবেক মালিক ও বড় খেলাপিদের ঘাড়ে, আর ১৮ক ধারার মতো কোনো পেছনের দরজা আর খোলা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, প্রতি বছর প্রকাশ্যে হিসাব দিতে হবে কত টাকা গেল, কত আদায় হলো, কত মামলার নিষ্পত্তি হলো, ঠিক যেভাবে মালয়েশিয়া আর সুইডেন করেছিল। তৃতীয়ত, ৫ থেকে ৮ বছরের এই খোলা চেক নয়, চাই নির্দিষ্ট সময়সীমা আর লক্ষ্য, যাতে খেলাপি ঋণের সংখ্যা বাড়া বন্ধ হয়। কারণ, নতুন ক্ষত তৈরি হতে থাকলে পুরোনো ক্ষত সারানোর টাকা কখনোই যথেষ্ট হবে না। ৬০ হাজার কোটি টাকা আমরা দিতে পারি, কিন্তু সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে আর কী ফল আনছে, তা জানার অধিকারও আমাদের আছে। জরিমানার রসিদ চাইলে সেটা বাড়াবাড়ি নয়।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

