সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে নতুন করে বড় অঙ্কের মূলধনসহায়তার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। সর্বোচ্চ ২০০ কোটি দিরহাম, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা দেওয়ার ‘দৃঢ় প্রতিশ্রুতি’ জানিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এর আগে মূলধন-ঘাটতি মেটাতে ৩০ কোটি দিরহাম, যা এক হাজার কোটি টাকার বেশি, পাঠানো হয়েছিল। তাতেও আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সন্তুষ্ট না হওয়ায় সরকারকে এবার আরও বড় নিশ্চয়তা দিতে হলো।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অর্থসচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারের স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিপত্র আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও সার্বিক মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। এ জন্য সর্বোচ্চ ২০০ কোটি দিরহাম বা সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। বর্তমান বিনিময় হারে এর পরিমাণ সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি।
সংকটের সূত্রপাত মূলধন সংরক্ষণ নিয়ে। আমিরাতের কেন্দ্রীয ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন থাকার কথা ৪০ কোটি দিরহাম। কিন্তু বাস্তবে ছিল মাত্র ১০ কোটি দিরহাম। অর্থাৎ প্রয়োজনের এক-চতুর্থাংশ। এই ঘাটতির কারণে আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটিতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত সেপ্টেম্বরে সরকার জনতা ব্যাংককে নির্দেশ দেয় আমিরাতে ৮ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার ১০৪ মার্কিন ডলার পাঠাতে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩ কোটি টাকা। এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ফলে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল আইনের চারটি শাখা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ব্যাংকটি ১৯৭৬ সাল থেকে আমিরাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা দিয়ে আসছে।
তবে সমস্যা এখানেই মেটেনি। জানা গেছে, সরকার মূলধন পাঠালেও আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা গ্রহণ করছিল না। তাদের অবস্থান ছিল, মূল জনতা ব্যাংক নিজেই আর্থিক সংকটে আছে এবং বড় ধরনের ঘাটতিতে রয়েছে। ফলে শুধু কিছু অর্থ পাঠিয়ে সংকট মেটানো যাচ্ছিল না। জনতা ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে সরকারের কাছ থেকে বড় আকারের মূলধন জোগানের নিশ্চয়তা চায় দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তারই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রতিশ্রুতি দিল।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও অর্থ বিভাগ ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিভাগটি জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত আইন ও প্রক্রিয়া মেনেই এটি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ একসঙ্গে পুরো অর্থ পাঠানো হবে কি না, নাকি ধাপে ধাপে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু এখনো জানা যায়নি।
অর্থসচিবের চিঠিতে আমিরাতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলোর গুরুত্বের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আমিরাতে বসবাসরত কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি এই চার শাখার মাধ্যমে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান। তাঁরা সঞ্চয়ী হিসাব পরিচালনা করেন এবং ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে বিনিয়োগ করেন। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও শাখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রবাসীদের এই সেবা এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব রক্ষার জন্যই সরকার এত বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। আমিরাতে ব্যাংকের স্থানীয় কার্যক্রম যেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধান মেনে নিরাপদ ও স্থিতিশীল থাকে, সেটিই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
এই ঘটনা দুটি দিক সামনে এনেছে। প্রথমত, প্রবাসী আয়ের বড় একটি উৎস আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ ঝুঁকিতে পড়েছিল। শাখাগুলো বন্ধ হলে লাখো প্রবাসীকে বিকল্প মাধ্যমে টাকা পাঠাতে হতো। দ্বিতীয়ত, বিদেশে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সরকারকে পরপর দুই দফায় বড় অঙ্কের অর্থ জোগান দিতে হচ্ছে, যা মূল ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আমিরাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার আপত্তির মূল কারণও ছিল মূল ব্যাংকের দুর্বল অবস্থা।
সব মিলিয়ে সরকারের এই প্রতিশ্রুতি আপাতত শাখাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা কমিয়েছে। তবে এই অর্থ কীভাবে, কত সময়ের মধ্যে এবং কোন উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে, তা পরিষ্কার না হলে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটবে না। একই সঙ্গে মূল জনতা ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি মজবুত করার উদ্যোগও জরুরি। না হলে বিদেশের শাখা বাঁচাতে বারবার বড় অঙ্কের অর্থ ঢালার প্রয়োজন পড়তে পারে।

