বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদ ও আমানতের সুদের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ এখনো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার দুই মাস পরও দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৫৫টি ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ৪ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে ব্যাংক খাতের গড় সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জুন মাসে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৯ জুন সুদের ব্যবধান কমানোর নির্দেশ দেওয়ার পরও বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ব্যাংকিং খাতে এই ব্যবধান টানা ২৮ মাস ধরে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ বা তার বেশি রয়েছে। এর ফলে একদিকে ঋণ নিতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের বেশি খরচ বহন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আমানতকারীরা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম লাভ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে ব্যাংকগুলোর গড় ঋণের সুদের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ।
ঋণের সুদ ও আমানতের সুদের পার্থক্য হিসাব করেই এই স্প্রেড নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ ব্যাংক যে হারে গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে এবং আমানতকারীদের যে হারে অর্থ ফেরত দিচ্ছে, তার মধ্যকার ব্যবধানই হলো সুদের ব্যবধান।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে গড় ঋণের সুদের হার ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে আমানতের সুদের হার ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে।তবে ঋণ ও আমানত—দুই ক্ষেত্রেই সুদের হার প্রায় একই হারে কমায় মোট ব্যবধানে বড় পরিবর্তন আসেনি।
মাত্র ছয় ব্যাংক মানতে পেরেছে নির্ধারিত সীমা
আগস্ট মাসে মাত্র ছয়টি ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে পেরেছে।এসব ব্যাংকের মধ্যে এবি ব্যাংকের ব্যবধান ছিল ০ দশমিক ৫২ শতাংশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ১ দশমিক ৮০ শতাংশ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
এর মধ্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ জুন মাসে নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল, তবে আগস্টে তারা ব্যবধান কমিয়ে আনে।আরও ১৪টি ব্যাংকের সুদের ব্যবধান ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে। জুন মাসে ব্যাংকটির সুদের ব্যবধান ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ, যা আগস্টে কমে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ঋণের সুদের হার কমিয়ে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অন্যদিকে আগস্টে সবচেয়ে বেশি সুদের ব্যবধান ছিল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।মোট ২১টি ব্যাংকের সুদের ব্যবধান ছিল ৬ শতাংশের বেশি।
বিদেশি ব্যাংকের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি
ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী দেখা যায়, বিদেশি ব্যাংকগুলোর গড় সুদের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি।
আগস্টে বিদেশি ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। এরপর বেসরকারি ব্যাংকের গড় ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর গড় সুদের ব্যবধান ছিল ৪ দশমিক ০২ শতাংশ।
২০২৩ সালের জুনে ব্যাংক খাতের গড় সুদের ব্যবধান ছিল ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এরপর থেকে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে বাধ্যতামূলক ৪ শতাংশ সুদ ব্যবধানের সীমা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালু করে।
এর পর থেকেই ব্যাংকগুলোর সুদের ব্যবধান দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এই ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, যা মে মাসে বেড়ে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং জুনে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৮ সালের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যবধান।
আমানত ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ছে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আমানতের প্রকৃত মুনাফা কম থাকলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখার আগ্রহ হারাতে পারে। এতে আনুষ্ঠানিক সঞ্চয় ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদের হার ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি সমস্যায় পড়ছেন, কারণ তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান দুর্বল চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ঋণের খরচ বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের মে মাসে নীতিগত সুদের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ শতাংশে নিয়ে যায়।
এরপর ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই নীতিগত সুদের হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। তবে আগস্ট পর্যন্ত এর প্রভাব ঋণের সুদের হারে বড়ভাবে দেখা যায়নি।
খেলাপি ঋণের চাপ দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সুদের ব্যবধান বেশি রাখার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপ।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক ব্যাংক নিজেদের মুনাফার সীমা ধরে রাখতে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান বেশি রাখছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু সুদের ব্যবধান নয়, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণগ্রহীতা, আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতি—সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

