ঋণখেলাপি অবস্থায় থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠান দুটি যাতে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারে, সে জন্য বিদ্যমান ঋণ বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ এবং শাইনপুকুর সিরামিকসের জন্য এই বিশেষ সুবিধা অনুমোদন করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনা করেই এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ জাতীয় ব্যাংকের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এতদিন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে ছিল। ফলে ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১০০ শতাংশ নগদ মার্জিনের বিপরীতে ঋণপত্র বা এলসি খুলতে পারবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন ঋণ সুবিধাও নিতে পারবে।এই বিশেষ ছাড় ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপি কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন কোনো ধরনের ঋণ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।আইনের ২৭কক(৩) ধারা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণগ্রহীতারা সাধারণত নতুন ঋণ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
এই বিধিনিষেধের কারণে বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ এতদিন ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে ব্যবসা চালু রাখা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ অনুমোদন দিয়েছে।তবে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন ঋণ সুবিধার কোনো দায় সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেবে না। ভবিষ্যতে এই সুবিধার কারণে জাতীয় ব্যাংকও সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
এছাড়া বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১কে তার সব আয় একটি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে। পরে সেই অর্থ থেকে নিয়মিতভাবে জাতীয় ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিকসকে।
প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি হওয়ায় বিদ্যমান কার্যকরী মূলধন ঋণ সীমা নবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতায় ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, জনস্বার্থ বিবেচনায় আইনগত বিধিনিষেধ শিথিল করে প্রতিষ্ঠানটির ১০৫ কোটি টাকার বিদ্যমান কার্যকরী মূলধন ঋণ সুবিধা নবায়নের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে শাইনপুকুর সিরামিকসকেও বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ এর মতো কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।প্রতিষ্ঠানের আয় নির্দিষ্ট হিসাবে জমা রাখা এবং সেই অর্থ থেকে ব্যাংকের পাওনা নিয়মিত পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ একদিকে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট খাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যাতে নতুন ঋণ সুবিধা ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়াও চলমান থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে বেক্সিমকোর এই দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া বিশেষ আইনগত ছাড়ের বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি আপাতত ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেলেও তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ওপর।

