বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকগুলোর সরাসরি কার্যক্রম শুরুর সুযোগ এবং বিনিয়োগে অর্থায়নের সম্ভাবনা তুলে ধরতে বেইজিংয়ে ‘বাংলাদেশ ডে’ আয়োজন করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না। আজ মঙ্গলবার চীনা ব্যাংকটির সদর দপ্তরে এই আয়োজনে চীনের ১১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন খাতের ২৬টি কোম্পানি অংশ নেয়। ইনভেস্ট বাংলাদেশের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না ও ব্যাংক অব চায়না। সম্পদের হিসাবে বিশ্বের বৃহত্তম চারটি ব্যাংকের তিনটিই এই আয়োজনে উপস্থিত ছিল। এ ছাড়া অবকাঠামো ও প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস, স্মার্ট ও শিল্পপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস এবং কৃষিপ্রযুক্তি খাতের ২৬টি চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিরাও এসেছিলেন।
প্রধান অতিথি ছিলেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বক্তব্য দেন চায়না এক্সিম ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াং কাং এবং চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নাজমুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্ট বাংলাদেশ যৌথভাবে ‘দ্য নেক্সট ফ্রন্টিয়ার: বাংলাদেশ-চায়না ফাইন্যান্সিয়াল কানেক্টিভিটি’ শীর্ষক উপস্থাপনা তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এত বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার পরও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো চীনা ব্যাংক সরাসরি কার্যক্রম চালাচ্ছে না।
উপস্থাপনায় তুলনামূলক চিত্রও দেওয়া হয়। বাংলাদেশের চেয়ে কম বা কাছাকাছি বাণিজ্য আছে, এমন কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারেও চীনা ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের উপস্থিতি বাড়ানো গেলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অর্থায়নের সুযোগ আরও প্রসারিত হতে পারে।
আয়োজনে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিনিয়োগ খাত, চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। এসব ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানি ও তাদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কী ভূমিকা রাখছে, সে বিষয়েও একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। পরে নেটওয়ার্কিং পর্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিনিয়োগ, অর্থায়ন ও সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা।
আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ হলো আর্থিক সংযোগ স্থাপন। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী চীনা কোম্পানিগুলোর সহজ ও কার্যকর বাণিজ্য অর্থায়ন, যন্ত্রপাতি কেনার অর্থায়ন, চলতি মূলধন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সহায়তা প্রয়োজন। দুই দেশের বাণিজ্যের বিপুল পরিমাণই এই চাহিদার প্রমাণ। অন্যদিকে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর দরকার প্রযুক্তি এবং ব্যবসা ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক অংশীদারত্ব। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়লে উভয় পক্ষ লাভবান হবে এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে।
চায়না এক্সিম ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াং কাং বলেন, চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁদের ব্যাংক বিশেষায়িত সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশে অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পসহ নানা খাতে ব্যাংকটির প্রায় ৪০টি প্রকল্প আছে। বস্ত্র ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অগ্রাধিকার খাতে আরও বেশি শীর্ষস্থানীয় চীনা কোম্পানিকে সরাসরি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে। এতে বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবামুখী অর্থনীতির বিকাশে অর্থায়ন ধারাবাহিক ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই আয়োজনের পেছনের বার্তাটি স্পষ্ট। বাংলাদেশ চাইছে, চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে চীনা ব্যাংকও দেশে আসুক, যাতে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থায়ন পান। তবে বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা বা কার্যালয় খোলার বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা জানানো হয়নি। এটি মূলত আগ্রহ তৈরি ও সম্ভাবনা তুলে ধরার উদ্যোগ। বাস্তবে কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, বাজারের পরিস্থিতি এবং চীনা ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের ওপর।

