ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের কতজন থাকতে পারবেন, আর একজন পরিচালক টানা কত বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে আবারও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ায় এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক এবং টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু গত ২০ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পর্যালোচনা সভায় ভিন্ন অবস্থান উঠে আসে। সেখানে পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার এবং পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছরের বদলে নয় বছর করার আলোচনা হয়েছে। তবে সিদ্ধান্তটি এখনো চূড়ান্ত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধিত খসড়া পাঠানোর পর তা মন্ত্রিসভায় যাওয়ার কথা।
বিষয়টি শুনতে আইনের জটিল হিসাব মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে আপনার আমার স্বার্থ সরাসরি জড়িত। কারণ ব্যাংকে যে টাকা জমা রাখি, তার বড় অংশই আমানতকারীদের অর্থ। সেই টাকা কাকে ঋণ দেওয়া হবে, কীভাবে ব্যাংক পরিচালিত হবে, সে সিদ্ধান্তে পরিচালকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হয় আমানতকারী ও করদাতাদের।
যে চিঠির জবাবও দেয়নি একটি ব্যাংক
প্রথম আলোর এক বিশ্লেষণে প্রয়াত ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের বলা একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এক বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবারের পাঁচজন পরিচালক ছিলেন, যদিও তখনকার আইনে দুজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংক অতিরিক্ত তিনজনকে সরিয়ে দিতে চিঠি পাঠালেও ব্যাংকটি তার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেনি।
এরপর আইনেই পরিবর্তন আসে। ২০১৮ সালে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ চারজন পরিচালক রাখার সুযোগ তৈরি হয়। পরে ২০২৩ সালের জুনে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী পাসের সময় পরিচালকদের টানা দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ১২ বছর করা হয়। মূল বিলে এ ধরনের প্রস্তাব না থাকলেও শেষ মুহূর্তে একজন সংসদ সদস্যের আনা সংশোধনী পাস হয়। এর প্রতিবাদে জাতীয় পার্টির সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
মেয়াদের এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ করার মতো। ২০১৮ সালের আগে একজন পরিচালক টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। পরে তা বেড়ে হয় নয় বছর, আর ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ১২ বছর। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে টানা দায়িত্ব পালনের সুযোগ দ্বিগুণ হয়েছিল। এখন নয় বছরের যে প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে, তা বর্তমান ১২ বছরের চেয়ে কম হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত ছয় বছরের চেয়ে বেশি। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বা বিএবিও বৈঠকে ১২ বছরের বদলে নয় বছরের মেয়াদের কথা বলেছে।
ব্যাংকের সব টাকা মালিকদের নয়
পরিচালকদের মেয়াদ ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। মুডিসের ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২.৮ শতাংশ বলা হয়েছে।
সহজ করে বললে, ব্যাংক যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় প্রতি তিন টাকার এক টাকা নির্ধারিত সময়ে ফেরত আসছে না। এর একটি বড় অংশের ঋণ আগে থেকেই সমস্যাগ্রস্ত ছিল, কিন্তু কঠোর নিয়মে হিসাব করার পর তা খেলাপি হিসেবে সামনে এসেছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, এত বিপুল পরিমাণ ঋণ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
ব্যাংক পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে বোঝা দরকার। ব্যাংকের সব টাকা মালিকদের নয়। আমানতকারীদের জমা রাখা অর্থ দিয়েই ব্যাংকের বেশির ভাগ ঋণ দেওয়া হয়। ধরুন, একটি ব্যাংকের মোট ১০০ টাকা রয়েছে। এর মধ্যে ১০ টাকা মালিকদের মূলধন, বাকি ৯০ টাকা আমানতকারীদের। ঋণ ফেরত না এলে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আলাদা রাখতে হয়। একে বলা হয় প্রভিশন। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং ক্ষতি বেশি হলে মালিকদের মূলধনও কমতে থাকে। বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী ডেইলি স্টারকে খেলাপি ঋণের কারণে মূলধন ক্ষয়ের বিষয়টি এভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন।
পরিচালকদের একে অপরের ব্যাংক থেকে ঋণ
খেলাপি ঋণের পেছনে পরিচালকদের ভূমিকা কতটা, তা বোঝার জন্য ডেইলি স্টারের একটি বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকেরা একে অপরের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের শেষে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চারটি ব্যাংক তাদের চেয়ারম্যান বা পরিচালকদের আত্মীয়দেরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল।
এখানেই স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। যাঁরা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁদের নিজেদের বা পরিচিতজনদের স্বার্থও যদি সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তাহলে ঋণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। একজন অন্যজনের ঋণে আপত্তি না করলে নিজের ঋণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা কমে যায়। ফলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক বিচারবুদ্ধির বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে সব তথ্যই যে হতাশার, তা নয়। মুডিসের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আগের এক বছরে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ সংকটের মধ্যেও মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখছে। এতে বোঝা যায়, ব্যাংক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি। এই আস্থা ধরে রাখতে হলে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিচালকদের ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত কমানোও জরুরি।
তিন বছরের বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ
বর্তমান আইনে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক একটি ব্যাংকের বোর্ডে থাকতে পারেন। এর বাইরে পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বোচ্চ দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচালক রাখার সুযোগও রয়েছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সুযোগের কারণে কাগজে পরিবারের পরিচালকের সংখ্যা তিনজন হলেও, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধির মাধ্যমে বোর্ডে পরিবারের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। হিসাব অনুযায়ী, তা পাঁচটি আসন পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। ২০ সদস্যের একটি বোর্ডে পাঁচটি আসন মানে মোট সদস্যের এক চতুর্থাংশ।
এই ধরনের প্রভাব কমাতেই বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবারের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। অন্যদিকে বিএবির অবস্থান হলো, পরিবারের সংজ্ঞা স্বামী, স্ত্রী ও নির্ভরশীল সদস্যদের মধ্যে সীমিত রাখা উচিত। তাদের যুক্তি, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার আইনেও এমন ব্যবস্থা রয়েছে।
পরিচালকদের মেয়াদ নিয়ে বিএবির বক্তব্যও বিবেচনার দাবি রাখে। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা পরিচালকদের ধরে রাখা জরুরি এবং মেয়াদ কমালে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। অভিজ্ঞতার মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা অর্জন করা আর একই পদে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ধরে রাখা এক বিষয় নয়। বর্তমান আইনেই ১২ বছর দায়িত্ব পালনের পর তিন বছরের বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই মেয়াদ কমানো মানেই অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের চিরতরে বাদ দেওয়া নয়। বরং একই ব্যক্তির দীর্ঘদিন ধরে বোর্ডে থাকার সুযোগ সীমিত করা।
স্বতন্ত্র পরিচালক: শুধু নামে, নাকি কাজেও
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কারা থাকবেন, তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়ায় ১৫ সদস্যের বোর্ড গঠনের প্রস্তাব ছিল, যার অর্ধেক হবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। তাঁদের বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা প্যানেল থেকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বর্তমানে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০ সদস্যের হতে পারে এবং স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা তিনজনের মধ্যে সীমিত। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও সর্বোচ্চ তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
বিএবির আপত্তি হলো, বোর্ডের অর্ধেক সদস্য স্বতন্ত্র হলে শেয়ারমালিকদের নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এতে ব্যাংক মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়ার চেয়ে নিয়মকানুন মেনে চলার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।
কিন্তু ব্যাংকের ক্ষেত্রে সুশাসনের গুরুত্ব আলাদা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী বলছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বেসেল কমিটির ২০১৫ সালের ব্যাংক করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালায় বলা হয়েছে, পরিচালকদের এমন কোনো স্বার্থের সংঘাত থাকা উচিত নয়, যা তাঁদের নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। বোর্ডের চেয়ারম্যানও হওয়া উচিত স্বতন্ত্র পরিচালক অথবা নির্বাহী দায়িত্বে নেই এমন কেউ।
ব্যাংক অন্যের টাকা নিয়ে ব্যবসা করে। তাই ব্যাংকের মালিকদের স্বার্থের পাশাপাশি আমানতকারীদের টাকার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হয়। স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে তাঁদের এমনভাবে নিয়োগ দেওয়া জরুরি, যাতে তাঁরা মালিকদের প্রভাবের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
কোন সংস্কার কীভাবে কার্যকর হবে
বিএবির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার প্রথম আলোকে বলেছেন, আগের খসড়ায় অনেক অসংগতি ছিল এবং তাঁদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। নতুন খসড়ায় ব্যাংক খাতের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, সংশোধিত আইনে আমানতকারীদের স্বার্থ ও সুশাসনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। বাজেটের পর বিএবি নিজেই ব্যাংকের মূলধন জোগানোর পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মালিকপক্ষেরও বক্তব্য রয়েছে। তবে কোন সংস্কার কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের নজরেও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ৪০ কোটি ডলারের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম টুর শর্তের মধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়টি রয়েছে। কর্মসূচির নথিতে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সম্পর্কিত পক্ষকে ঋণ দেওয়াকে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবারের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধতা থাকায় জটিল পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেওয়া ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল হওয়ার বিষয়টিও সেখানে উঠে এসেছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। বিশ্বব্যাংকের শর্তে আইন সংশোধনের কথা থাকলেও পরিবারের কতজন পরিচালক থাকবেন বা পরিচালকদের মেয়াদ কত বছর হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়নি। এদিকে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের পরামর্শ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ দিয়েছে বলে ডেইলি স্টারের মে মাসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারাটি পাঁচটি একীভূত ইসলামী ব্যাংকের সাবেক মালিকদের আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের সংস্কার কোন দিকে যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও পর্যবেক্ষণ করছে।
শেষ পর্যন্ত এই ক্ষতির টাকা দেবে কে?
মুডিসের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের মূলধনে ফিরিয়ে নিতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ লাগতে পারে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ব্যাংক খাতে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা করে বাজেট থেকে দিতে হবে। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের জন্য ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হয়েছে।
এই অর্থ আসে মূলত জনগণের করের টাকা থেকে। অন্যদিকে, আমানত বিমার আওতায় বর্তমানে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা রয়েছে। এর বেশি টাকা যাঁরা ব্যাংকে রাখেন, তাঁদের দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া তুলনামূলক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত হতে পারে।
এর বাইরেও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। সরকারের রাজস্ব কম হলে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি ব্যবসার জন্য ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসনের অভাব শেষ পর্যন্ত ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সংখ্যার হিসাব নয়, আসল প্রশ্ন জবাবদিহি
ব্যাংক কোম্পানি আইন নিয়ে বর্তমান বিতর্ক থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, একই পরিবারের দুজন না তিনজন পরিচালক থাকবেন, কিংবা একজন পরিচালক ছয় বছর না নয় বছর দায়িত্ব পালন করবেন, শুধু এই হিসাব দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবারের সংজ্ঞা কতটা বিস্তৃত হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচালকের মাধ্যমে পারিবারিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ বন্ধ হবে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, ভালো আইন করলেই হবে না, সেটি কার্যকর করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির জবাব না দেওয়ার মতো ঘটনা দেখায়, নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকলে কাগজে লেখা বিধানের খুব বেশি মূল্য থাকে না। নতুন খসড়ায় পুরো বোর্ড ভেঙে না দিয়েও প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সংকটের সময় এটি দ্রুত হস্তক্ষেপে সাহায্য করতে পারে। তবে বোর্ড বহাল রেখেই অনিয়ম বন্ধ করা কতটা সম্ভব, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত পরিচালকদের পদে থাকার বিধান শিথিল হলে ঋণশৃঙ্খলা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ব্যাংক চলে মানুষের আমানতের টাকায়। তাই পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা শুধু মালিকদের বিষয় নয়, এটি আমানতকারীদের নিরাপত্তারও অংশ।
এখনো খসড়াটি মন্ত্রিসভা ও সংসদের চূড়ান্ত ধাপ পেরোয়নি। ফলে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইনে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বা পরিচালকদের মেয়াদ যা-ই নির্ধারণ করা হোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন ব্যবস্থা রাখা, যাতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা মালিকের প্রভাব ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। কারণ ব্যাংকের বোর্ডরুমে জবাবদিহি দুর্বল হলে তার মূল্য শুধু ব্যাংকমালিকেরা দেন না, সেই বোঝা এসে পড়ে আমানতকারী ও সাধারণ করদাতার ওপরও।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

