দেশের কয়েকটি শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদের হার কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। অথচ গত সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ মিলছে, তা মূল্যস্ফীতির চেয়েও কম। কর ও অন্যান্য চার্জ কেটে নিলে আমানতকারীর হাতে থাকা প্রকৃত আয় আরও কমে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক এবং ব্যাংকের সুদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো। সুদের আয় দিয়ে বাড়তি ব্যয় মেটানো তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। শুধু তা-ই নয়, সুদ পেলেও মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চিত অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমছে।
ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে কয়েকটি বড় ব্যাংক দুই দফায় মেয়াদি আমানতের সুদ কমিয়েছে। ব্যাংকভেদে কমানোর পরিমাণ ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট। গত জুলাইয়ে এক বছর মেয়াদি আমানতে ৯ থেকে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যেত। আগস্টে তা নেমে আসে ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকে হার আরও কমে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। প্রাইম ব্যাংকে এই হার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
একটি সহজ হিসাব দিলেই ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়। কেউ ১০ লাখ টাকা এক বছরের জন্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে জমা রাখলে বছর শেষে মোট সুদ পাবেন ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ থাকলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই আয় সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না। এর ওপর উৎসে কর, আবগারি শুল্কসহ অন্যান্য চার্জ যুক্ত হলে হাতে আসা অর্থ আরও কমে যায়। ফলে ব্যাংকে জমা টাকার অঙ্ক বাড়লেও সেই টাকায় আগের চেয়ে কম পণ্য ও সেবা কেনা যেতে পারে। আমানতকারীর আয় কমে যাওয়ার মূল সমস্যা এটিই।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সুদের হার কমায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চাপে পড়বেন। কারণ, অনেকেই ব্যাংকের সুদ দিয়ে সংসারের খরচ চালান। মূল্যস্ফীতি বেশি থাকার সময়ে সুদ কমা তাঁদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে সুদের হার চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে। যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো, তাদের নতুন আমানতের প্রয়োজন কম। তাই সুদ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী মনে করেন, যেসব ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা বেশি, সেখানে আমানত বাড়লে সুদ কমানো স্বাভাবিক। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় এটি প্রচলিত চর্চা। এতে ঋণের সুদ কমার সম্ভাবনাও তৈরি হয়, যা ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক। তবে আমানতকারীরা কম সুদ পাবেন, এটি তাঁদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
সুদ কমানোর পেছনের কারণ ব্যাংক খাতে অলস অর্থের পাহাড়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে মোট তারল্য ছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিধিবদ্ধ ন্যূনতম তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। সে হিসাবে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
এত অর্থ হাতে থাকলেও ব্যাংকগুলো তা ঋণ হিসেবে দিতে পারছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি দুর্বল হওয়ায় ঋণের চাহিদা কম। ফলে জমা অর্থের বড় অংশ অলস পড়ে থাকছে, অথবা সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে যাচ্ছে। ব্যাংকারদের তথ্য বলছে, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে আছে। ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণের উচ্চ সুদ এর অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে আমানত বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ব্যাংক খাতে গড় আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংকে এই প্রবৃদ্ধি ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। সংকটে থাকা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অনেক গ্রাহক তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে জমা রাখছেন, ফলে এসব ব্যাংকের আমানত আরও ফুলে উঠছে। ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন জানান, তাঁদের ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় ঋণ কম হওয়ায় উল্লেখযোগ্য অর্থ উদ্বৃত্ত থাকছে।
ব্যাংকের জন্য আমানত একটি দায়। গ্রাহকের টাকা নিয়ে তা ঋণ বা বিনিয়োগে খাটিয়ে আয় করতে হয়। কিন্তু অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া না গেলে ব্যাংককে একদিকে সুদ গুনতে হয়, অন্যদিকে প্রত্যাশিত আয় আসে না। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনার খরচ বাড়ে। সেই ব্যয় নিয়ন্ত্রণেই সুদ কমাচ্ছে ব্যাংকগুলো। দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সুদ কমানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে সুদের হার কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় কিছু ব্যাংক এখন তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আমানত সংগ্রহে বেশি জোর দিচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদ কমে আসছে। সাধারণত সরকারি সিকিউরিটিজের সুদ ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য সুদহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। ফলে বিল-বন্ড থেকে আয় কমলে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদও সমন্বয় করতে পারে।
তবে সব ব্যাংকের চিত্র এক নয়। কিছু দুর্বল ব্যাংক এখনো আমানত সংগ্রহে তুলনামূলক বেশি সুদ দিচ্ছে। এতে আমানতের সুদহারে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এ কারণে শুধু বেশি সুদের প্রস্তাব দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ও আমানতের নিরাপত্তাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ঋণগ্রহীতারা কতটা সুবিধা পাবেন, সে প্রশ্নও উঠছে। ব্যাংকগুলোর যুক্তি, আমানতের সুদ কমলে তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমবে। এতে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আমানতের সুদ কমলেই ঋণের সুদ একই হারে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ঋণের সুদ নির্ভর করে তহবিল ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, ঝুঁকি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।
ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকও নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় উদ্বৃত্ত তারল্য কমছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের চাহিদা বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এগিয়ে এলে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। তাতে ব্যাংকের আয় বাড়বে, অর্থনীতিতেও গতি ফিরতে পারে।
সঞ্চয়কারীদের জন্য বিকল্প নিয়ে ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী বলেন, আমানতকারীরা সঞ্চয়পত্র বা পুঁজিবাজারের মতো বিকল্প বিনিয়োগ বিবেচনা করতে পারেন। তবে পুঁজিবাজারে মুনাফার সম্ভাবনার সঙ্গে লোকসানের ঝুঁকিও আছে। তাই শুধু বেশি আয়ের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ খাতে অর্থ সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমানতকারীদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঞ্চয়ের নিরাপত্তা বজায় রেখে মূল্যস্ফীতির ক্ষতি যথাসম্ভব কমানো। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত সুদের আয়ে সংসার চালান, তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নতুন করে সাজাতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সুদ কমার প্রবণতা জোরালো হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ঋণগ্রহীতারা কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ পাওয়ায় আমানতকারীর প্রকৃত আয় কমছে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে সংসার সামলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষের জন্য সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া আর্থিক অনিশ্চয়তাকেই আরও বাড়িয়ে তুলছে।

