ব্যাংক থেকে ১০০ টাকা ঋণ দেওয়া হলে তার প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি, অর্থাৎ নিয়মিত ফেরত আসছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। বিষয়টি শুধু ব্যাংকারদের উদ্বেগের নয়। কারণ ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ আসে আপনার-আমার জমানো আমানত থেকে। অথচ সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আটকে আছে হাতে গোনা কিছু বড় ঋণগ্রহীতার কাছে।
এত টাকা কি হঠাৎ খেলাপি হলো, নাকি আগেই ছিল?
খেলাপি ঋণের গত কয়েক বছরের হিসাব দেখলে পরিবর্তনটা স্পষ্ট হয়। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের ১২.৫৬ শতাংশ। একই বছরের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকায়, বা ২০.২০ শতাংশে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছায়। ডিসেম্বরে তা প্রায় ৩১ শতাংশে নেমে এলেও এর পেছনে ছিল বড় আকারের ঋণ পুনঃতফসিল। ২০২৬ সালের মার্চে হার আবার বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশ এবং জুনে ৩২.৭৮ শতাংশ হয়। আইএমএফের তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে। তবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা চাদের তথ্য ২০২৩ সালের, তাই দুই দেশের অবস্থান তুলনায় এই সময়ের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।
তাহলে কি দুই বছরের মধ্যে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ ঋণ শোধ বন্ধ করে দিয়েছেন? পুরো বিষয়টি তেমন নয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে কোনো ঋণের কিস্তি এক বছর পর্যন্ত অনাদায়ি থাকলেও সেটি সব সময় খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হতো না। এখন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণ হওয়ায় আগে নিয়মিত দেখানো অনেক ঋণের প্রকৃত অবস্থা সামনে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসংকট, ব্যবসায় মন্দা এবং প্রভাব খাটিয়ে বেনামে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ। অর্থাৎ, সমস্যার একটি বড় অংশ আগে থেকেই ছিল; এখন তা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হচ্ছে। আবার ঋণ পুনঃতফসিল বা অবলোপনের মাধ্যমে কাগজে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমলেও প্রকৃত পাওনা আদায় হয়েছে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রথম আলোর বিশ্লেষণেও এই পার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
অল্প কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার কাছে বিপুল অর্থ আটকে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং খাতবিষয়ক হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া ৫ হাজার ৭৭৫ জন ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এটি তখনকার মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক। আবার ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া ২ হাজার ২৭৩ জনের খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। মাথাপিছু গড় খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ১ কোটি টাকার কম ঋণ নেওয়া প্রায় ৪৪ লাখ ২০ হাজার ছোট ঋণগ্রহীতার মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৬১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। মাথাপিছু গড় প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। হিসাব করলে দেখা যায়, বড় ঋণগ্রহীতাদের একটি গোষ্ঠীর মাথাপিছু গড় খেলাপি ঋণ ছোট ঋণগ্রহীতাদের গড়ের প্রায় ছয় হাজার গুণ। অবশ্য এই তুলনা দুই গোষ্ঠীর ঋণের ধরন ও ব্যবসার আকারের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েই বুঝতে হবে। তবু পরিসংখ্যানটি দেখায়, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কতটা বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে কেন্দ্রীভূত।
নিউ এজের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি মূল্যায়নের বরাতে বলা হয়েছে, দেশের শীর্ষ ৫০ ব্যবসায়ী গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে জামানতের মূল্য প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে খেলাপি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই হিসাব অনুযায়ী, জামানতের মূল্য মোট ঋণের মাত্র এক-চতুর্থাংশের মতো। ফলে এসব ঋণের বড় অংশ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়লে ব্যাংকগুলোর ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
একটি ব্যাংকের হিসাবেও বড় ঋণগ্রহীতার ওপর নির্ভরতার চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৬৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছেই ছিল প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট খেলাপি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। কোনো একটি গ্রুপের কাছে এত বড় অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত হলে সেই গ্রুপ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
ঋণের পরিমাণ নয়, বড় প্রশ্ন টাকা কার হাতে গেল
বড় ঋণগ্রহীতার কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। বেসেল কমিটির বড় ঋণগ্রহীতা-সংক্রান্ত কাঠামোয় একক ঋণগ্রহীতা বা পরস্পর সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাদের গোষ্ঠীর ঋণসীমা সাধারণভাবে ব্যাংকের টায়ার-১ মূলধনের ২৫ শতাংশ। এর যুক্তি সহজ: একটি ব্যাংকের সামগ্রিক মূলধন যথেষ্ট মনে হলেও এক বা দুইটি বড় ঋণে বিপুল ক্ষতি হলে সেই ব্যাংক বিপদে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি রিপোর্ট ২০২৪ একই ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ওই বছরের শেষে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেমে এসেছিল ৩.০৮ শতাংশে, যা নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার অনেক নিচে। স্ট্রেস টেস্টে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় দুই ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর গুরুতর চাপ তৈরি হতে পারে। ২০২০ সালের প্রতিবেদনেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছিল, শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং তাদের নিজের পুঁজির তুলনায় ঋণ বেশি থাকা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, জিডিপির তুলনায় বেসরকারি ঋণের ব্যবধান বহু বছর ধরে নেতিবাচক ছিল। অর্থাৎ, পুরো অর্থনীতির আকারের তুলনায় বেসরকারি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি, এমন সংকেত পাওয়া যায়নি। তাহলে সংকট কোথায়? সমস্যাটি শুধু ঋণের মোট পরিমাণে নয়, বরং ঋণ কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে, কী যাচাইয়ের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে এবং সেই ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা, সেখানেই।
ব্যবসা বাড়ানো ভালো, কিন্তু টাকাটা কার?
বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের বিষয়টি দুটি প্রশ্নে দেখা দরকার। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি যে নতুন ব্যবসায় যাচ্ছে, সেখানে তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কতটা? দ্বিতীয়ত, সেই সম্প্রসারণের টাকা আসছে কোথা থেকে?
সি কে প্রহ্লাদ ও গ্যারি হ্যামেল ১৯৯০ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে লিখেছিলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি তার সম্মিলিত দক্ষতার মধ্যে নিহিত। নতুন ব্যবসায় প্রবেশের ক্ষেত্রেও সেই দক্ষতাকে কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গবেষণায়, বার্জার ও ওফেক ১৯৯৫ সালে জার্নাল অব ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকসে দেখিয়েছিলেন, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে একাধিক ব্যবসায় যুক্ত মার্কিন কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য তাদের ব্যবসাগুলো আলাদাভাবে মূল্যায়ন করলে যে পরিমাণ হতো, তার তুলনায় গড়ে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ কম ছিল। একই ধরনের শিল্পে থাকা ব্যবসার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান তুলনামূলক কম ছিল। গবেষকেরা অতিরিক্ত বিনিয়োগ এবং লাভজনক ব্যবসার আয় দিয়ে দুর্বল ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন।
তবে এখানে সতর্কতা জরুরি। গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো নিয়ে, বাংলাদেশের নয়। পরে গ্রাহাম, লেমন ও উলফের গবেষণায় দেখা যায়, এই ব্যবধানের বড় একটি অংশের পেছনে আগে থেকেই কম দামে থাকা ব্যবসা অধিগ্রহণের ভূমিকা ছিল। তাই একাধিক খাতে ব্যবসা করলেই কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল্য কমে যায়, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। মূল প্রশ্ন হলো, নতুন ব্যবসাটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি কতটা।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও সরাসরি আমানতকারীদের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিজের পুঁজিতে নতুন ব্যবসা শুরু করে লোকসান হলে ক্ষতির বড় অংশ মালিককেই বহন করতে হয়। কিন্তু ঋণের টাকায় ব্যবসা করলে ব্যবসা লাভ করুক বা না করুক, সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকে। নতুন ব্যবসা শুরুতে স্থায়ী আয় দিতে না পারলে এই চাপ আরও বাড়ে। মালিকের নিজের পুঁজি কম এবং ব্যাংকের ঋণ বেশি হলে ব্যবসা সফল হওয়ার লাভ মালিকের কাছে যেতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতার বড় অংশ গিয়ে পড়ে ব্যাংকের ওপর। অর্থনীতিতে এই ঝুঁকিকে বলা হয় ‘নৈতিক ঝুঁকি’ বা মোরাল হ্যাজার্ড।
গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও জটিল হতে পারে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপের অধীনে শতাধিক কোম্পানি রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো শেল বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান বলে অভিযোগ আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণও খেলাপি হয়েছে। ব্যাংক যদি প্রতিটি কোম্পানিকে আলাদা করে মূল্যায়ন করে, তাহলে পুরো গ্রুপের সম্মিলিত ঋণঝুঁকি আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি শুধু ঋণ অনুমোদনের বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মালিকানা ও আর্থিক সম্পর্ক চিহ্নিত করারও প্রশ্ন।
ব্যাংকের দরজা সবার জন্য কি সমানভাবে খোলা ছিল?
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পেতে কাগজপত্র ও নিয়মকানুনের কঠোর পরীক্ষা দিতে হয়। অথচ বড় ঋণের ক্ষেত্রে যে বাড়তি যাচাই থাকার কথা, বাস্তবে তা সব সময় যথাযথভাবে হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ কর্মসূচিসংক্রান্ত নথিতেও দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পারিবারিক সম্পর্কের সংজ্ঞায় দুর্বলতা থাকায় একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণ প্রকৃত আকারে শনাক্ত করাও কঠিন হতে পারে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সেলিম রহমান বণিক বার্তাকে বলেছেন, ব্যবসাটি টেকসই কি না, তা বিবেচনা না করে শুধু জমির জামানতের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া বিপজ্জনক। এ বিষয়ে সংস্কারের কিছু প্রস্তাবও এসেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী খসড়ায় একই পরিবার থেকে ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সীমা তিনজন থেকে কমিয়ে দুইজন করার প্রস্তাব রয়েছে। আরেকটি প্রস্তাব হলো, কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে সেই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান যেন নতুন ঋণ না পায়। চলতি বছরের বাজেট বক্তৃতায়ও অর্থমন্ত্রী পারিবারিক প্রভাব কমাতে আইন সংশোধনের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, এসব পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিচ্ছেন কারা?
ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সংকটের মূল্য সাধারণ মানুষকে অন্তত দুইভাবে দিতে হয়। প্রথমত, ব্যাংক পুনর্গঠনে সরকারি অর্থ ব্যয় হলে তার বোঝা গিয়ে পড়ে করদাতার ওপর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক পুনর্গঠন খাতে সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
দ্বিতীয় ক্ষতিটি তুলনামূলক নীরব, কিন্তু ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের বিপুল অর্থ খেলাপি ঋণে আটকে থাকলে নতুন উদ্যোক্তা ও ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪.৭২ শতাংশে নেমে আসে, যা রেকর্ডের সর্বনিম্ন পর্যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গোলটেবিল বৈঠকে বলা হয়েছিল, ব্যাংকঋণের ৭৫ শতাংশের বেশি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়। নিউ এজের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১০ লাখ টাকার কম ঋণ নেওয়া গ্রাহকেরা মোট ঋণগ্রহীতার প্রায় ৯৪ শতাংশ হলেও মোট ব্যাংকঋণের দশ ভাগের এক ভাগও পান না। অর্থাৎ, ঋণের সংখ্যা ও ঋণের অর্থের বণ্টনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাইয়ের শেষ দিকে রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ করেছে, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথম কমানো। তবে সুদ কমলেই যে নতুন ঋণ বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি, ব্যবসায়ীদের আস্থা এবং অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ; সবই ঋণপ্রবাহকে প্রভাবিত করে।
তাহলে সমাধানের পথ কী?
প্রথমত, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা এবং ব্যবসার বাস্তব সংকটে পড়া; এই দুই ধরনের ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করে দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরি বণিক বার্তাকে বলেছেন, খেলাপিদের বড় অংশই ইচ্ছাকৃত। অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের একাংশ ব্যাংকের দুর্বল নজরদারি ও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত উদ্যোক্তারা সাধারণত ঋণ শোধ করেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ও পরিস্থিতির শিকার খেলাপির অনুপাত কত, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানা না থাকলে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
তাই আমার প্রস্তাব, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত করে আদায়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অন্যদিকে, যেসব ব্যবসা বাস্তবে চালু রাখা সম্ভব এবং যাদের নগদ প্রবাহ দিয়ে ঋণ শোধের বাস্তব সম্ভাবনা আছে, তাদের জন্য শর্তসাপেক্ষ পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা যেতে পারে। ইউক্রেনের উদাহরণ এখানে বিবেচনা করা যায়। প্রথম আলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বরের ২৩.৯১ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারিতে ১৩.৯২ শতাংশে নেমে আসে। এর কারণ ছিল পুরোপুরি প্রভিশন করা পুরোনো ঋণ হিসাব থেকে সরিয়ে নেওয়া। তবে ঋণ আদায়ের অধিকার বাতিল হয়নি; বেসরকারি ব্যাংক লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলেও আইনি লড়াই চালিয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা হলো, হিসাবের খাতা থেকে ঋণ সরানো আর বাস্তবে টাকা উদ্ধার করা এক বিষয় নয়।
দ্বিতীয়ত, বড় ঋণগ্রহীতাদের সীমা নির্ধারণে ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। ১৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংক একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা ব্যাংকের মূলধনের ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করেছে। আগের সীমা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণের হারের ভিত্তিতে শর্তও যুক্ত হয়েছে: খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের কম হলে কোনো ব্যাংক মোট ঋণের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বড় ঋণগ্রহীতাদের দিতে পারবে; আর খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি হলে এই সীমা ৩০ শতাংশ। নীতিটির উদ্দেশ্য ভালো ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন আটকে না রাখা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের প্রতিবেদনে যখন ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা ৩.০৮ শতাংশে নেমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে, তখন ঋণসীমা বাড়ানোর ঝুঁকিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই নীতির সাফল্য নির্ভর করবে ঋণ অনুমোদনের স্বচ্ছতা, প্রকৃত মালিকানা যাচাই এবং ব্যাংকের মূলধন কতটা শক্তিশালী, তার ওপর।
তৃতীয়ত, বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোরও মনে রাখা উচিত, ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে সম্প্রসারণের একটি সীমা আছে। নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করাটা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো, সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বারবার নতুন ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে কি না। বড় হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, কিন্তু ঝুঁকির বড় অংশ যদি শেষ পর্যন্ত আমানতকারী ও করদাতার ওপর এসে পড়ে, তাহলে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের বড় সম্প্রসারণ পরিকল্পনা দেখলে তিনটি প্রশ্ন করা জরুরি: টাকাটা আসছে কোথা থেকে, নতুন ব্যবসাটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, আর ঋণের কিস্তি পরিশোধের নগদ আয় কোথা থেকে আসবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিষ্কার না হলে ঝুঁকিটি শুধু কোম্পানির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না, আপনার-আমার আমানতেও তার প্রভাব পড়ে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

