বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির সতর্কতার পর টানা তৃতীয় দিনেও বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। সম্ভাব্য সাইবার হামলা ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যোগাযোগ ও কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন পর্যন্ত ওয়েবসাইটে সফল সাইবার হামলা বা তথ্য চুরির কোনো ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওয়েবসাইটটি চালু করা হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তবে ওয়েবসাইটটি কবে নাগাদ আবার চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি। ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত একটি বার্তা দেখা যাচ্ছে।
বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ত্রুটিগুলোর কারণে আক্রান্ত সার্ভারে অনুমতি ছাড়াই দূর থেকে ক্ষতিকর নির্দেশ চালানো কিংবা সংবেদনশীল তথ্যের নাগাল পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের গবেষকেরা গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তায় ত্রুটি শনাক্ত ও বিশ্লেষণে ভূমিকা রাখেন। এসব ত্রুটি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশের আগেই সব ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা হালনাগাদ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তবে পিএইচপি ব্যবহার করে তৈরি সব ওয়েবসাইটই আক্রান্ত, এমন নয়। ব্যবহৃত সংস্করণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে।
বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই গভর্নমেন্ট সিআইআরটি এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সার্ভারে পিএইচপির কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ পরিস্থিতিতে ওয়েবসাইট বন্ধ রেখে নিরাপত্তা যাচাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে।
ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার অর্থ ব্যাংকের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে। অর্থাৎ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে না পারার বিষয়টি এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যকার আর্থিক কার্যক্রম এক করে দেখার সুযোগ নেই।
তবে ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তা কেবল ওয়েবসাইট চালু রাখার বিষয় নয়। কোনো দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা সার্ভারে প্রবেশ করতে পারলে তথ্য চুরি, সেবা ব্যাহত করা কিংবা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ওয়েবসাইট চালু করার চেয়ে ঝুঁকি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা, নিরাপত্তা যাচাইয়ের অগ্রগতি এবং পুনরায় চালুর সময় সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়াও জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য সাইবার নিরাপত্তা নতুন উদ্বেগ নয়। ২০১৬ সালে হ্যাকাররা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। এরপর ২০২৩ সালেও সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ওয়েবভিত্তিক সেবা ৩৬ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল।
এবারের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সফল অনুপ্রবেশ বা তথ্য চুরির নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। তাই একে সাইবার হামলার ঘটনা হিসেবে নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করার চেয়ে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকির কারণে নেওয়া সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করাই যথাযথ। ওয়েবসাইট পুনরায় চালুর আগে নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করা এবং ঝুঁকির প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য প্রকাশ করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

