একজন গ্রাহক ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদ্মা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় গিয়েছিলেন মেয়াদি আমানতের দুই লাখ টাকা তুলতে। কিন্তু টাকা না পেয়ে তাঁকে ফিরতে হয়। এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই টাকা ফেরত পাননি তিনি। অথচ গুলশানের ফাইন্যান্স স্কয়ার ভবনের ভাড়া বাবদ ব্যাংকটি প্রতি মাসে ৬০ লাখ টাকা দিয়ে যাচ্ছে। এই অর্থ জমা হচ্ছে ডায়নেস্টি হোমস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। সিআইডির তদন্তে বলা হয়েছে, ভবনটির জমির সঙ্গে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী ও নাবালক ছেলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। চলুন এবার হিসাবটা একটু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। আমানত সুরক্ষা আইনে একজন গ্রাহকের সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষার বিধান রয়েছে। সেই হিসাবে, এক মাসের ভাড়ার টাকা দিয়ে ৩০ জন আমানতকারীর সুরক্ষিত অর্থের সমপরিমাণ টাকা পরিশোধ করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, সিআইডির এসব তথ্য তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ। আদালতে এখনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। এ বিষয়ে নাফিজ সরাফাতের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের হিসাবের খাতা কী বলছে
ভাড়ার বিষয়টি বোঝার আগে পদ্মা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দেখা জরুরি। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের নিরীক্ষায় ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ৬ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল ব্যক্তিগত আমানতকারীদের। বাকি অর্থের মধ্যে ছিল সরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানত।
ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় সমস্যা ঋণ আদায়ে। বিতরণ করা ঋণের ৯৪.৫১ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ব্যাংক যেসব ঋণ দিয়েছে, তার বড় অংশই নির্ধারিত নিয়মে ফেরত আসছে না। অথচ এই ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংক ব্যবহার করে আমানতকারীদের জমা রাখা অর্থ। ঋণ আদায় না হলে আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মূলধনের অবস্থাও আরও উদ্বেগজনক। ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নিজস্ব মূলধনের অনুপাতকে বলা হয় সিআরএআর। নিয়ম অনুযায়ী, এ অনুপাত ১২.৫ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু পদ্মা ব্যাংকের সিআরএআর মাইনাস ১৮৭.১৪ শতাংশে নেমেছে। ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কাজী মো. তালহা স্বীকার করেছেন, পাওনা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত তারল্য নেই। ঋণ আদায় থেকে যখন যত টাকা আসে, তা দিয়ে অল্প অল্প করে দেনা পরিশোধের চেষ্টা চলছে। এর সঙ্গে রয়েছে নেতৃত্বের সংকট। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করার পর থেকে ব্যাংকটিতে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই।
দুই লাখ টাকার কোম্পানি, ৫২ কোটির ভবন
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী,, ২০২২ সালে নাফিজ সরাফাত যখন চেয়ারম্যান, তখন ব্যাংক তিনটি চুক্তিতে ডায়নেস্টি হোমসকে অগ্রিম দিয়েছে ১৪.০৭ কোটি টাকা। ভাড়া ঠিক হয় প্রতি বর্গফুট ২৫০ টাকা, জায়গা প্রায় ২৪ হাজার বর্গফুট, যেখানে প্রধান কার্যালয়, একটি মূল শাখা ও একটি ইসলামি ব্যাংকিং শাখা। অঙ্ক মিলিয়ে দেখুন, মাসে ঠিক ৬০ লাখ আসে।
সিআইডি বলছে, গুলশানের ৯ কাঠার প্লটটি হেবা দলিলে স্ত্রী ও নাবালক ছেলের নামে দেওয়া হলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল কার্যত নাফিজের হাতেই। নির্মাণ চুক্তিতে ছেলে জমির মালিক, ডায়নেস্টি ডেভেলপার। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো তথ্য হলো, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নিবন্ধিত ডায়নেস্টি হোমসের অনুমোদিত মূলধন ১০ কোটি টাকা হলেও পরিশোধিত মূলধন মাত্র দুই লাখ, অথচ তারা ৫২.৪৪ কোটি টাকার ২০ তলা ভবনের কাজ হাতে নেয়।
সিআইডির ভাষ্য, এমন কোম্পানি ব্যাংকের ভেতরের সুবিধাভোগীদের স্বার্থে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। পরের বছর, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর, সিআইডি নাফিজ সরাফাত ও আরও তিনজনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে গুলশান থানায় মামলা করে। সেই মামলায় ফান্ডের টাকা ব্যবহার করে ফারমার্স ব্যাংকের (এখনকার পদ্মা) শেয়ার কেনার অভিযোগও রয়েছে।
নিয়ম ছিল, তবু কেন আটকাল না
এখানে একটা মজার, আবার উদ্বেগেরও, বিষয় আছে: নিয়মের দুটি ব্যাখ্যা পাশাপাশি চলছে। সিআইডি বলছে, পরিচালকের স্বার্থ জড়িত প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য বা সেবা নেওয়া নিষিদ্ধ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার ১২ (১৫ জুন ২০২২) এই লেনদেনে লঙ্ঘিত হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বিষয়টি বার্ষিক সাধারণ সভায় তুলে প্রকাশ করা হলে এবং ভাড়া বাজারদরের সঙ্গে মিললে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে জায়গা ভাড়া নেওয়ায় সরাসরি আইনি নিষেধ নেই। ফৌজদারি অপরাধ জড়িত থাকলে অবশ্য ভিন্ন কথা। টিবিএসের তথ্য অনুযায়ী লেনদেনটি অনুমোদন পায় তৎকালীন গভর্নরের সময়ে। আমার বিশ্লেষণে আসল ফাঁকটা এখানেই। কাগজে নিয়ম আছে, কিন্তু “বাজারদর” কে মাপবে, “প্রকাশ” হলো কিনা কে নিশ্চিত করবে, সেই জায়গাটা ফাঁকা থেকে গেছে।
এখানে একটি সর্বজনস্বীকৃত নীতি খাটে, যাকে বলে আর্মস লেংথ নীতি। এর অর্থ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের মধ্যে লেনদেন হলেও শর্ত এমন হতে হবে, যেন তারা একে অপরের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কহীন স্বাধীন পক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের “বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য” শর্তও একই কথা বলে। তুলনার জন্য একটা মাপকাঠি দেওয়া যায়।
২০২৬ সালের মার্চের সার্কুলারে ঢাকায় ব্যাংকের ভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা প্রতি বর্গফুট ১০৪ টাকা, আর স্বার্থের সংঘাত থাকলে ও প্রধান কার্যালয়ের ভাড়ায় আগাম অনুমোদন লাগে। পদ্মা ব্যাংকের ভাড়া ছিল প্রতি বর্গফুটে ২৫০ টাকা। তবে এই তুলনাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ সার্কুলারটি চুক্তির পরে জারি হয়েছে, সীমাটি মূলত শাখার জন্য এবং গুলশানের অবস্থানের কারণে ভাড়ায় বাড়তি মূল্যও থাকতে পারে।
ব্যাংক কেন এখনো ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে
ব্যাংকটি এখনো কেন এই ভবনে ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কাজী মো. তালহা।নতুন ভবনে গেলে আবার বড় অঙ্কের অগ্রিম ও সাজসজ্জার খরচ লাগবে, যা ব্যাংকের নেই, আর এই ভবন ছাড়লে আগের বিনিয়োগ বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে।
যুক্তিটা শুনতে স্বাভাবিক, কিন্তু অর্থনীতির একটা প্রতিষ্ঠিত নীতি এখানে প্রশ্ন তোলে। একে বলে সাংক ক্যাস্ট বা ডুবে যাওয়া খরচ। যে ১৪ কোটি টাকা অগ্রিম একবার দেওয়া হয়ে গেছে, থাকুন বা ছাড়ুন, সেটা আর ফেরার নয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয় সামনের খরচ ধরে। থাকলে বছরে ভাড়া যায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। সরে গেলে নতুন অগ্রিম, সাজসজ্জা আর নতুন ভাড়া। কোনটা সস্তা, সেই তুলনা আমি কোথাও প্রকাশিত দেখিনি।
তাই আমার মত, সবার আগে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন হওয়া দরকার। ভাড়া বাজারদরের সমান হলে আপত্তি অনেক কমে যায়, বেশি হলে বাড়তি অংশের দাম দিচ্ছেন আমানতকারীরাই।
এখানে একটা ভারসাম্যের কথাও বলা দরকার। বছরে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাড়া ব্যাংকের ৬ হাজার ২২৪ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতির প্রায় ০.১ শতাংশ। অর্থাৎ, শুধু ভাড়া বন্ধ করলেই ব্যাংকের সংকট কেটে যাবে না। আবার ভাড়া চলতে থাকলেই ব্যাংকটি ডুবে যাবে, এমনও নয়। বিষয়টির গুরুত্ব মূলত সুশাসন ও জবাবদিহিতে। ব্যাংক যখন আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, তখন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির শর্ত কতটা ন্যায্য, সেই প্রশ্নের জবাব থাকা দরকার।
সরকারি অর্থ দিয়ে ব্যাংক বাঁচালে লাভ কার?
ব্যাংকটি প্রথমে ৩ হাজার ৫০০ কোটি, পরে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চেয়েছে, আর এক পর্ষদ সদস্যের হিসাবে স্থিতিশীলতা ফেরাতে অন্তত ৮ হাজার কোটি লাগবে। টিবিএস জানাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি সেই সহায়তা দেয়নি। তবে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের জরুরি সহায়তার হিসাবে ব্যাংকটির জন্য ২৫২ কোটি টাকার উল্লেখ রয়েছে। ফলে আগের সহায়তা এবং নতুন করে চাওয়া অর্থ দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, উদ্বেগের কারণ ছিল, নাফিজ সরাফাতের প্রতিনিধিত্বকারী ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ডের পর্ষদে উপস্থিতি, যা রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পরিচালিত। ওই কর্মকর্তার আশঙ্কা, সরকারি অর্থ দিয়ে ব্যাংককে সহায়তা করলে অতীতের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও পরোক্ষভাবে লাভবান হতে পারেন।
অর্থনীতিতে এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় মরাল হ্যাজার্ড। সহজ ভাষায়, কেউ যদি ধরে নেন যে নিজের সিদ্ধান্তে ক্ষতি হলেও শেষ পর্যন্ত অন্যের টাকা দিয়ে তা পূরণ করা হবে, তাহলে ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই ব্যাংককে বাঁচানোর পাশাপাশি কারা অনিয়মের জন্য দায়ী, তাঁদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
তবে বিষয়টির অন্য দিকও আছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী এই চার সরকারি ব্যাংকের হাতে পদ্মা ব্যাংকের প্রায় ৬৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ জনগণের অর্থ ইতিমধ্যেই এই ব্যাংকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ব্যাংকটির গভর্নর আগে বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ বিপুল আমানত আটকে রয়েছে, সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতের ওপরও পড়তে পারে।
অক্টোবরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, পদ্মা ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং ব্যাংকটিকে সচল করার চেষ্টা চলছে। গত ১৪ অক্টোবর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করে টাকা ফেরতের সময়সূচি চেয়েছেন। এদিকে ১৯ অক্টোবর সরকার সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চুক্তি বাতিল করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
টাকা ফেরানোর বাস্তব পথ কী?
পদ্মা ব্যাংকের আমানতকারীরা এখন এক অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। ২০২৬ সালের আমানত সুরক্ষা আইনে একজন আমানতকারীর সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে ১৭ কর্মদিবসের মধ্যে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কিন্তু নিউ এজের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে অবসায়ন বা রেজ্যুলেশনের আওতায় না এলে আমানতকারীরা এ তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ পান না।
সংসদে অর্থমন্ত্রী যে পাঁচটি ব্যাংককে রেজ্যুলেশনের আওতায় আনার কথা বলেছেন, পদ্মা ব্যাংক সেগুলোর মধ্যে নেই। জুলাইয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, সংকটে থাকা ব্যাংকের আমানতকারীরা সুদসহ পুরো টাকা পাবেন, কোনো হেয়ারকাট হবে না। রেজ্যুলেশন আইনের ৫৭ ধারায় দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ ও আয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিক্রি বা নিলামের মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ উদ্ধারের সুযোগও রয়েছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতি ও আইনি ব্যবস্থার কতটা পদ্মা ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এখানে প্রথম প্রয়োজন একটি সময়বদ্ধ সিদ্ধান্ত। ব্যাংকটিকে কীভাবে পুনরুদ্ধার করা হবে, নাকি রেজ্যুলেশনের আওতায় নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। অনির্দিষ্টকাল পরিস্থিতি ঝুলিয়ে রাখলে আমানতকারীদের অনিশ্চয়তা বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, ছোট আমানতকারীদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দুই লাখ টাকার সুরক্ষা সীমায় দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ ব্যাংক হিসাব পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়। পদ্মা ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই অনুপাত কত, তা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ছোট আমানতকারীদের পাওনা আগে মেটানোর ব্যবস্থা করা গেলে অনেক পরিবার দ্রুত স্বস্তি পেতে পারে। এরপর বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের নিষ্পত্তির পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, অনিয়মের অভিযোগে যাঁদের সম্পদ জব্দ বা ক্রোকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেসব সম্পদ থেকে অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া দ্রুত করা প্রয়োজন। এর আগে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনে নাফিজ সরাফাত ও তাঁর পরিবারের ২২টি ফ্ল্যাটসহ কিছু সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছিলেন। সিআইডির অর্থ পাচারের মামলাটিও চলমান। তবে অর্থ উদ্ধার যত দেরি হবে, আমানতকারীদের পাওনা মেটানোর পথ তত কঠিন হতে পারে।
ব্যাংকটির নেতৃত্বের সংকটেরও সমাধান দরকার। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক না থাকা প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর পরিচালনা ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ মেয়াদ তিন মাস। তাই দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থার অবসান ঘটানোও জরুরি।
ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে যা করা দরকার
পদ্মা ব্যাংকের ঘটনা থেকে একটি শিক্ষা স্পষ্ট। স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে শুধু নিয়ম থাকলেই হবে না, সেই নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ করাও জরুরি। এ ধরনের চুক্তি স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, চুক্তি করার সময়ই তা প্রকাশ করতে হবে এবং অডিট কমিটির স্বাধীন অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। বছর শেষে সাধারণ সভায় তথ্য প্রকাশের ওপর নির্ভর করলে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠার আগেই লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের সার্কুলারে প্রধান কার্যালয়ের ভাড়া ও স্বার্থের সংঘাতের ক্ষেত্রে আগাম অনুমোদনের শর্ত যুক্ত হওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন জরুরি হলো, এই নিয়ম বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে দ্রুত, যাতে সংকট তৈরি হওয়ার পর শুধু আমানতকারীদের ক্ষতি সামাল দিতে না হয়।
যে আমানতকারী নিজের দুই লাখ টাকা তুলতে গিয়েও ফেরত পাননি, তাঁর অভিজ্ঞতাই পদ্মা ব্যাংকের সংকটের মানবিক দিকটি সামনে আনে। এই সংকট শুধু একটি ব্যাংকের লোকসানের হিসাব নয়; এটি ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা এবং সাধারণ মানুষের জমানো টাকা কতটা নিরাপদ, তারও পরীক্ষা। মাসে ৬০ লাখ টাকা ভাড়া বন্ধ করলেই হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি মিটবে না। কিন্তু আমানতকারীরা যখন নিজেদের টাকা ফেরত পেতে অপেক্ষা করছেন, তখন ব্যাংক কেন এবং কী শর্তে স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভবন ভাড়া নিচ্ছে, সেই হিসাব স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। কারণ ব্যাংকের আর্থিক সংকটে শুধু লোকসানের অঙ্ক নয়, কার স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ: ব্যাংক সংকটে পড়লে প্রথমে কার স্বার্থ রক্ষা করা হবে, মালিক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের, নাকি আমানতকারীর?
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

