দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্থানীয় ঋণপত্রসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক সুইফট ব্যবস্থার পরিবর্তে আগামী নভেম্বর মাস থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বার্তা বিনিময়ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর বার্ষিক লেনদেন ব্যয় প্রায় ৭৫ কোটি টাকা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নতুন ব্যবস্থাটি মূলত দেশের অভ্যন্তরে ব্যাংকগুলোর মধ্যে পরিচালিত ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধ কিংবা বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থার কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আগামী মাসেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ২২ অক্টোবর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈঠকে রোববার (২৫ অক্টোবর) থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কীভাবে কাজ করবে নতুন ব্যবস্থা
বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো ঋণপত্রসংক্রান্ত বিভিন্ন আর্থিক বার্তা পাঠাতে আন্তর্জাতিক সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। বেলজিয়ামভিত্তিক এই বৈশ্বিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নিরাপদ ও নির্ধারিত কাঠামোয় আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।
তবে সুইফট নিজে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর করে না। এটি মূলত ব্যাংকগুলোর মধ্যে আর্থিক নির্দেশনা ও তথ্য পাঠানোর একটি নিরাপদ মাধ্যম। প্রকৃত অর্থ পরিশোধ ও নিষ্পত্তি হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর হিসাবের মাধ্যমে।
সুইফটের সেবা ব্যবহারের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট মাশুল দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের একটি অংশ ঋণপত্র ও বার্তা পাঠানোর খরচ হিসেবে গ্রাহকদের কাছ থেকেও আদায় করা হয়।
নতুন উদ্যোগের আওতায় দেশের দুটি ব্যাংকের মধ্যে স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের বার্তা পাঠাতে আর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালিত নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে এই তথ্য সরাসরি আদান-প্রদান করা যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন সেবাটি ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কোনো মাশুল নেবে না। ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে। তবে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কতটা সুবিধা পাবেন, তা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো নিজেদের গ্রাহকসেবার মাশুল কমায় কি না, তার ওপর।
ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে রপ্তানিকারকেরা বিদেশি ক্রেতার দেওয়া ক্রয়াদেশের বিপরীতে প্রয়োজনীয় কাপড়, সুতা ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করতে পারেন।
ধরা যাক, ইউরোপের একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানাকে ১০ লাখ মার্কিন ডলারের পোশাক তৈরির ক্রয়াদেশ দিয়েছে। এ জন্য বিদেশি ক্রেতার ব্যাংক প্রথমে একটি মূল ঋণপত্র খুলল।
পোশাক তৈরির জন্য বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের স্থানীয় একটি বস্ত্রকল থেকে কাপড় কেনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকের ব্যাংক বিদেশি ক্রেতার মূল ঋণপত্রের বিপরীতে স্থানীয় বস্ত্রকলের নামে আরেকটি ঋণপত্র খুলতে পারে।
এই ব্যবস্থায় বস্ত্রকল ব্যাংকের অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে কাপড় সরবরাহ করতে পারে। অন্যদিকে রপ্তানিকারককে উৎপাদনের শুরুতেই সম্পূর্ণ অর্থ নগদ পরিশোধ করতে হয় না। পরবর্তী সময়ে রপ্তানি আয় থেকে সংশ্লিষ্ট অর্থায়নের দায় পরিশোধ করা হয়।
এ ধরনের সুবিধা তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বড় ক্রয়াদেশের বিপরীতে আগাম কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের ব্যবহার ব্যাপক।
তবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং যোগাযোগও যুক্ত থাকতে পারে। বিদেশি ক্রেতার মূল ঋণপত্র বিদেশি ব্যাংক থেকে ইস্যু হলেও স্থানীয় সরবরাহকারীর জন্য দ্বিতীয় ঋণপত্র দেশের ব্যাংক খুলে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থা কেবল দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যকার যোগ্য স্থানীয় ঋণপত্রের বার্তা বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আগের মতোই আন্তর্জাতিক সুইফট ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে।
বছরে ৭৫ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের বার্তা আদান-প্রদানে নতুন ব্যবস্থা ব্যবহার করলে ব্যাংক খাতে বছরে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বার্তা পাঠানোর মাশুল কমে যাওয়াই এই সাশ্রয়ের প্রধান উৎস।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর আরেফিন জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে স্থানীয় ঋণপত্রের তথ্য পাঠানো সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক বার্তা প্রেরণের খরচ কমবে।
নতুন ব্যবস্থার বার্তার কাঠামো আন্তর্জাতিক সুইফট ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ সংযোগ স্থাপন, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম, প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং রক্ষণাবেক্ষণে কিছু ব্যয় বহন করতে হবে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদান-প্রদান হবে ঋণপত্রের তথ্য
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর প্রচলিত বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ থাকবে। এতে আলাদাভাবে তথ্য প্রবেশ করানোর প্রয়োজন কমতে পারে এবং ঋণপত্রের বার্তা পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হতে পারে।
বার্তার কাঠামোয় সুইফটের প্রচলিত এমটি ৭০০, এমটি ৭০৭ এবং এমটি ৭৯৯ ধরনের আদর্শ অনুসরণ করা হয়েছে। এর ফলে ঋণপত্র ইস্যু, সংশোধন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বার্তা আদান-প্রদানে পরিচিত কাঠামো ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থার সংযোগ নিশ্চিত করতে তথ্য আদান-প্রদানের প্রযুক্তিগত সংযোগপদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এতে বারবার হাতে তথ্য প্রবেশ করানোর প্রয়োজন কমার পাশাপাশি ভুলের ঝুঁকিও হ্রাস পেতে পারে।
তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতার প্রয়োজন
দেশীয় বার্তা বিনিময়ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে খরচ কমানোর সুযোগ থাকলেও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ, এই ব্যবস্থায় রপ্তানিকারক, সরবরাহকারী, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং ঋণপত্রের অর্থায়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান হবে। কোনো ধরনের সাইবার হামলা, অননুমোদিত প্রবেশ কিংবা প্রযুক্তিগত ত্রুটি ঘটলে ব্যাংকিং কার্যক্রমের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের সরবরাহব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের সক্ষমতা যাচাই, শক্তিশালী পরিচয় শনাক্তকরণ, গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে একাধিক অনুমোদন এবং তথ্য পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্য নথি সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাশাপাশি ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে নিরাপদ সংযোগ, সন্দেহজনক কার্যক্রমের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা সচল রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নতুন ব্যবস্থায় জালিয়াতির ঝুঁকি কতটা
মাশরুর আরেফিনের মতে, নতুন বার্তা বিনিময়ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে নিজে থেকে জালিয়াতির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কথা নয়। কারণ, এই ব্যবস্থায় শুধু অনুমোদিত প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রবেশাধিকার পাবেন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট নিরাপদ কম্পিউটার, পৃথক ব্যক্তিগত যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনুমোদিত সংযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগে ব্যাংকগুলো পরস্পরের মধ্যে পরীক্ষামূলক ঋণপত্রের বার্তা পাঠিয়ে ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা যাচাই করবে।
তবে তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থার তথ্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
তথ্যের কাঠামো ও অর্থ এক না হলে হিসাব সমন্বয় এবং ঋণপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বার্তার মান অনুসরণ, তথ্যের সঠিক মিল এবং প্রতিটি লেনদেন শনাক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য নথি সংরক্ষণ জরুরি।
রপ্তানি খাতে কতটা সুফল আসবে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় অংশ স্থানীয় কাপড়, সুতা ও আনুষঙ্গিক উপকরণ সংগ্রহে ব্যাংকিং অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ঋণপত্রসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের খরচ ও সময় কমানো গেলে রপ্তানিমুখী শিল্পের কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমার সুবিধা সরাসরি রপ্তানিকারক ও স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমলেও গ্রাহকদের ঋণপত্রসংক্রান্ত মাশুল অপরিবর্তিত থাকলে ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা নাও পেতে পারেন।
অন্যদিকে তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত, নির্ভুল ও নিরাপদ হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় সময় সাশ্রয় হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি স্থানীয় বাণিজ্য অর্থায়নের ব্যয় কমানো এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ।
তবে নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, ব্যাংকগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং ব্যয় সাশ্রয়ের সুফল ব্যবসায়ীদের কাছে কতটা পৌঁছায়, তার ওপর।

