দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট এখন আর কেবল খেলাপি ঋণ, তারল্য ঘাটতি কিংবা মূলধনসংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর গভীরে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব এবং জনগণের আমানত ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তোলার প্রবণতা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই লুণ্ঠনের একটি বড় অংশ সংঘটিত হয়েছে বৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রমের আবরণে।
করপোরেট ঋণ, আমদানি-রপ্তানি, শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেলেও তার প্রকৃত ব্যবহার, সুবিধাভোগী মালিকানা এবং চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা যায়নি।
ফলে দেশের অর্থনীতিতে এমন একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ করা ঋণই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ঋণগ্রহীতার পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, জামানতের প্রকৃত মূল্য এবং ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে—এসব বিষয়ে যথাযথ যাচাই না থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু মুদ্রানীতি পরিচালনা কিংবা ব্যাংকের হিসাব পর্যবেক্ষণ নয়; বরং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষা, ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত বড় ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার আগাম সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি হয়েছে।
করপোরেট ঋণের আড়ালে অর্থ পাচারের জটিল কৌশল। করপোরেট ঋণ মূলত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও সম্প্রসারণের জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু এই ঋণ যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা না হলে তা অর্থ পাচারের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নথিপত্র, ব্যাংকিং লেনদেন এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক হিসাব ব্যবহার করে অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য গোপন করা সম্ভব।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত পদ্ধতি হলো বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার বা ট্রেডভিত্তিক অর্থ পাচার। এর মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির পণ্যমূল্য, পরিমাণ কিংবা সরবরাহের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ স্থানান্তর করা হয়।
এর একটি পরিচিত কৌশল হলো আমদানিতে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো। উদাহরণস্বরূপ, কোনো যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য ১০ লাখ ডলার হলেও আমদানির নথিতে তার মূল্য এক কোটি ডলার দেখানো হলো। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ওই পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাঠানো হলে প্রকৃত পণ্যমূল্যের অতিরিক্ত অংশ বিদেশে অবস্থানরত বিক্রেতা, সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীর কাছে থেকে যেতে পারে। বিপরীতভাবে, রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে বাকি অর্থ বিদেশে রেখে দেওয়ার মাধ্যমেও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ তৈরি হয়।
আরেকটি পদ্ধতি হলো ভুয়া আমদানি কিংবা পণ্য সরবরাহের অস্তিত্ব ছাড়াই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা তৈরি করা। জাল চালান, পরিবহনসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ভুয়া বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে ব্যাংককে প্রকৃত লেনদেন সম্পর্কে বিভ্রান্ত করা হতে পারে। একইভাবে একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কৃত্রিম লেনদেন সৃষ্টি করে অর্থের উৎস আড়াল করার প্রবণতাও রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে অনেক সময় নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান বা শেল কোম্পানি জড়িত থাকে। কাগজে-কলমে পৃথক কোম্পানি দেখানো হলেও সেগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ একই ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে থাকতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে আড়াল করা হয়।
বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের পরিমাণ কতটা ভয়াবহ। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মূল্য ও ঘোষণাগত অসংগতি যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত গবেষণায়।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রায় ৬৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যিক মূল্যগত অসংগতি শনাক্ত হয়েছে। বছরে গড়ে এর পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ও রপ্তানির ঘোষিত মূল্য এবং বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর নথিতে পাওয়া মূল্যের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। এই ৬৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারকে আদালতে প্রমাণিত অর্থ পাচারের চূড়ান্ত পরিমাণ বলা যাবে না। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তথ্যের অসংগতি থেকে পাওয়া সম্ভাব্য অবৈধ আর্থিক প্রবাহের গবেষণাভিত্তিক অনুমান। তবে এর ব্যাপকতা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য তদারকিতে বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশ বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। ৩৭টি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষণাটি তৈরি করা হয়। অর্থাৎ অর্থ পাচার প্রতিরোধে শুধু ব্যাংক হিসাব পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। আমদানি-রপ্তানির প্রতিটি পর্যায়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য, পরিমাণ, উৎস, গন্তব্য এবং অর্থ পরিশোধের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকভিত্তিক চিত্রেও সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা, যার অনুপাত ৭৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত গবেষণাতেও জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, সুশাসনের ঘাটতি, ঋণের প্রকৃত অবস্থা শনাক্ত করতে বিলম্ব এবং ঋণ পুনর্গঠনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে সব খেলাপি ঋণই যে অর্থ পাচারের ফল, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই। ব্যবসায়িক লোকসান, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা অর্থনৈতিক মন্দাও ঋণখেলাপির কারণ হতে পারে। কিন্তু বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি কিংবা বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের অভিযোগ পাওয়া গেলে সেগুলোকে সাধারণ ব্যবসায়িক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যাংক লুণ্ঠনের সংস্কৃতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট নিয়ে ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত একাদশ বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যাংক থেকে নতুন করে দেওয়া ঋণ প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কোথায়? অতীতে ব্যাংকঋণের অর্থ যেভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে, নতুন ঋণের ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা ফিরে আসছে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সরকারের সময় এসব ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা বিতরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি ব্যাংকিং খাতের সংকটকে শুধু ঋণখেলাপির সংস্কৃতি হিসেবে দেখেননি; বরং ব্যাংকের অর্থ সরাসরি লুটপাটের প্রবণতাকে আরও ভয়াবহ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, ব্যাংকিং খাতের সংকট এখন শুধু পুরোনো ঋণ আদায়ের সমস্যা নয়। নতুন করে বিতরণ করা ঋণও যদি যথাযথ যাচাই ও তদারকি ছাড়া দেওয়া হয়, তাহলে সংস্কারের নামে আবারও একই আর্থিক অনিয়মের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কোথায় দুর্বল? বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে ব্যাংক পরিদর্শন, ঋণসীমা নির্ধারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তদারকি, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও অর্থ পাচার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। তবু বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়মের ঘটনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—ঋণ অনুমোদনের আগেই ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি কেন?
একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যখন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন শুধু পৃথক ব্যাংকের ঋণ হিসাব দেখলে প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা সম্ভব নয়। একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন সব প্রতিষ্ঠানের ঋণ একত্রে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাদের প্রকৃত মালিকানা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং ব্যাংকগুলোর কাছে সম্মিলিত দায় কত—এসব তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাই করা না হলে বড় ঋণগ্রহীতারা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। এখানে একক ঋণগ্রহীতা সীমা, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান, জামানতের স্বাধীন মূল্যায়ন এবং ঋণ বিতরণ-পরবর্তী পর্যবেক্ষণের কার্যকারিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি যদি কেবল অনিয়মের পর তদন্ত, নিরীক্ষা কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা প্রতিরোধমূলক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাফল্য নির্ভর করে কতটি অনিয়ম ঘটার পর তদন্ত হয়েছে তার ওপর নয়; বরং কতটি বড় অনিয়ম ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা গেছে, তার ওপর।
বিএফআইইউর ভেতরেও জবাবদিহির প্রশ্ন। অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা হলো বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা এর অন্যতম দায়িত্ব।
বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে সংস্থাটি মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রতিবেদন পেয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৭৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন।
একই সময়ে ব্যাংকগুলো থেকেই এসেছে মোট প্রতিবেদনের প্রায় ৯৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান একদিকে আর্থিক নজরদারি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে সন্দেহজনক লেনদেনের ব্যাপকতাও তুলে ধরে। বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মো. মামুন জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংস্থাটির নজরদারি ও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক ও সরকারি খাতের বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনসহ সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর মতে, সন্দেহজনক লেনদেনসংক্রান্ত প্রতিবেদন বৃদ্ধির পেছনে এসব কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ অনুসন্ধান, সম্পদের উৎস যাচাই এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এদিকে ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএফআইইউ বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোশাররফ হোসেন, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য তলব করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্পদের তথ্য ও আয়ের উৎসসংক্রান্ত প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবে অর্থ পাচার প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তা স্পষ্ট হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান অন্যদের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, তার নিজের কার্যক্রমও হতে হবে প্রশ্নাতীত।
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও বিদেশে গড়ে তোলা সম্পদ শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর আওতায় ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি বড় প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা অর্থ ও সম্পদের অবস্থান অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আইনি ও আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ৯ আগস্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আটটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি, পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার, ক্রল, আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং এবং ডেন্টনসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশে সম্পদের অবস্থান অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাফল্যনির্ভর পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর প্রাথমিক ব্যয়ের চাপ কম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিদেশে সম্পদ শনাক্ত করা এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের অনুমোদন, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ফলে অর্থ উদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এ উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করলেই চলবে না; দেশীয় ব্যাংকগুলোর নথিপত্রের নির্ভুলতা, তদন্তের মান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্কারের নামে নতুন ছাড়, পুরোনো অনিয়মের আশঙ্কা। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটাতে ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, তারল্য সহায়তা এবং বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া অর্থনীতির স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও অর্থ আত্মসাৎকারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুবিধা প্রয়োগ করা হলে তা সুশাসনের পরিবর্তে অনিয়মকে উৎসাহিত করবে।
এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, পুরোনো ঋণের দায় আড়াল করতে নতুন ঋণ দেওয়া কিংবা বারবার পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি অবস্থাকে সাময়িকভাবে গোপন রাখা। এতে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা আড়ালে থেকে যায় এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত হয়। তাই ঋণ পুনর্গঠন করতে হবে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। কারখানা সচল আছে কি না, উৎপাদন হচ্ছে কি না, কর্মসংস্থান বজায় রয়েছে কি না, ঋণগ্রহীতার নিজস্ব বিনিয়োগ কত এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থ পাচার প্রতিরোধে প্রযুক্তি ও জবাবদিহির নতুন কাঠামো। বর্তমান আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থ পাচারের কৌশল ক্রমেই জটিল হচ্ছে। তাই প্রচলিত কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা শনাক্ত করতে হবে। একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ একত্রে বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানি-রপ্তানির ঘোষিত মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করার জন্য সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। পণ্যের ধরন, পরিমাণ, উৎসদেশ, গন্তব্য এবং পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য একত্রে যাচাই করা গেলে অতিমূল্যায়ন ও অবমূল্যায়নের ঝুঁকি কমবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের ঋণ বিতরণের পর অর্থের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ঋণের অর্থ নির্ধারিত প্রকল্পের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত হিসাব কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা তৈরির ব্যবস্থা প্রয়োজন। চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন, একই ঠিকানা বা মালিকানার একাধিক প্রতিষ্ঠান, অস্বাভাবিক আমদানি মূল্য এবং দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের মতো বিষয় শনাক্ত করতে এ প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে। তবে প্রযুক্তির সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মানবিক যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, ব্যাংক কর্মকর্তা, নিরীক্ষক, ঋণ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকদের দায় নির্ধারণ করতে হবে। অনিয়মে সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। ষষ্ঠত, বিএফআইইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তার ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন।
নীরব নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধ। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। করপোরেট ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে অর্থ স্থানান্তর এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।
ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমানতকারীর নিরাপত্তা, শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান এবং দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে এখন তদন্তনির্ভর ও ঘটনাপরবর্তী তদারকির সীমা অতিক্রম করে প্রতিরোধমূলক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বড় ঋণ অনুমোদনের আগে কঠোর যাচাই, ঋণের অর্থ ব্যবহারের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল্য যাচাই এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা শনাক্তকরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। যেসব কর্মকর্তা বা ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ চলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই পদ্ধতিতে অর্থ বেরিয়ে যেতে না পারে, সেই প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
সবচেয়ে বড় কথা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু আইনে নিশ্চিত করলেই হবে না; বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও জবাবদিহিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে আইন ও নীতিমালা কেবল আনুষ্ঠানিক দলিল হয়ে থাকবে।
ব্যাংকঋণ কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি সাধারণ মানুষের আমানত এবং জাতীয় অর্থনীতির সম্মিলিত পুঁজি। এই অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে আর কোনো দীর্ঘসূত্রতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অর্থ পাচার প্রতিরোধে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কঠোর জবাবদিহি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরবতা ভেঙে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হলে ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষত আরও গভীর হবে, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে পুরো জাতিকে।

