মূলধনের ভিত মজবুত করতে নতুন করে বন্ড বাজারে যাচ্ছে মেঘনা ব্যাংক। ব্যাংকটি ৪০০ কোটি টাকার দ্বিতীয় সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বন্ডের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সাত বছর মেয়াদি এ বন্ডের অর্থ ব্যাংকটির টায়ার-২ মূলধনে যুক্ত হবে।
শুক্রবার ব্যাংকটির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পর্যাপ্ত মূলধন ধরে রাখা, ঝুঁকি সামলানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলা ব্যাংকগুলোর জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সেই প্রয়োজন থেকেই এ বন্ড আনা হচ্ছে।
মূলধন বাড়লে ব্যাংকের ঋণ ও বিনিয়োগের সক্ষমতাও বাড়ে। ব্যাংকটি আশা করছে, এই অর্থ শিল্পায়ন, উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং চালু ব্যবসার সম্প্রসারণে কাজে লাগবে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বন্ডটির মুনাফার হার স্থির নয়, এটি পরিবর্তনশীল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ছয় মাস মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সর্বোচ্চ সুদহারের গড়কে ভিত্তি ধরে একটি রেফারেন্স হার নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ মার্জিন যোগ করে কুপন হার ঠিক হয়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রেফারেন্স হার ছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। মার্জিন যোগ হওয়ায় ওই দিন বার্ষিক কুপন হার দাঁড়ায় ১২ দশমিক ০৫ শতাংশে। বাজারে আমানতের সুদহার বাড়লে বন্ডের মুনাফাও বাড়বে। সুদহার কমলে মুনাফাও কমবে। অর্থাৎ এ বন্ডের আয় বাজারের সুদের গতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বন্ডটির প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য ৫ লাখ টাকা। এটি প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ছাড়া হচ্ছে, অর্থাৎ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। প্রযোজ্য আইন ও শর্ত মেনে যোগ্য ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এতে অর্থ খাটাতে পারবেন। ইউনিটপ্রতি বড় অঙ্কের কারণে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর পক্ষে এতে অংশ নেওয়া তুলনামূলক কঠিন হবে।
ব্যাংকটির পরিকল্পনা, বন্ডটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল মঞ্চে তালিকাভুক্ত করা। তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে এটি কেনাবেচা করতে পারবেন। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনে অর্থ তুলে নেওয়ার একটি পথ খোলা থাকবে। তবে কেনাবেচা আসলে কতটা সচল হবে, তা নির্ভর করবে বাজারে এ বন্ডের চাহিদার ওপর।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, আয়কর আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত হলে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাবেন। বন্ডটিতে আবগারি শুল্ক নেই। ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের মতো কিছু বিনিয়োগে সর্বোচ্চ সীমা থাকলেও এ বন্ডে বিনিয়োগের আলাদা কোনো ঊর্ধ্বসীমা রাখা হয়নি।
ব্যাংকটির দাবি, প্রচলিত সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত ও ডিপিএসের তুলনায় এ বন্ডে বেশি মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ১২ দশমিক ০৫ শতাংশ কুপন হার বর্তমান মেয়াদি আমানতের সুদের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি। উচ্চ আয়ের এই আকর্ষণ বড় বিনিয়োগকারীদের টানতে পারে।
তবে বেশি মুনাফার সঙ্গে ঝুঁকির প্রশ্নও থাকে। সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড সাধারণত আমানতকারী ও অন্য ঋণদাতাদের পাওনা মেটানোর পরের সারিতে থাকে। তাই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা, মূলধন পরিস্থিতি ও বন্ডের শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বন্ডের বিনিয়োগকারীরা প্রতি ছয় মাস পরপর কুপন আয় পাবেন। আসল টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে তৃতীয় বছর শেষ হওয়ার পর। ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এরপর পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর মূল বিনিয়োগের ২০ শতাংশ করে ফেরত দেওয়া হবে। এতে আসল একবারে না দিয়ে কয়েক কিস্তিতে ফেরত যাবে, ফলে বিনিয়োগকারীর হাতে নিয়মিত নগদ প্রবাহ থাকবে। একই সময়ে ব্যাংকের ওপরও একসঙ্গে বড় অঙ্কের চাপ পড়বে না।
ব্যাংকটির মতে, এ বন্ড বিনিয়োগকারীদের সামনে বিকল্প একটি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। দেশের করপোরেট বন্ড বাজারের বিকাশেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের তুলনায় বন্ডবাজার এখনো ছোট। ব্যাংকগুলো মূলধন জোগাড়ে বন্ডের দিকে ঝুঁকলে এ বাজার ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সুযোগ পাবে।
সব মিলিয়ে এই বন্ড ব্যাংকের মূলধনের ভিত শক্ত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি আয়ের একটি পথ খুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত সফলতা নির্ভর করবে বন্ডটির তালিকাভুক্তি, বাজারে এর সক্রিয় লেনদেন এবং ব্যাংকটির নিজস্ব আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর।

