বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আমানত সংগ্রহকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, উচ্চ নীতি সুদহার, দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট এবং আর্থিক খাতে আস্থার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে আমানত সংগ্রহ এখন বড় কৌশলগত অগ্রাধিকার।
গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে কোনো কোনো ব্যাংক মেয়াদি আমানত ও বিশেষ সঞ্চয় প্রকল্পে তুলনামূলক বেশি সুদ বা মুনাফা ঘোষণা করছে। কিছু ক্ষেত্রে বার্ষিক হার দুই অঙ্কে পৌঁছাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কম সুদের আমানতে অভ্যস্ত গ্রাহকদের সামনে সঞ্চয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হলেও একই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন।
তবে এ প্রতিযোগিতাকে পুরো ব্যাংকিং খাতের সুদের হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ব্যাংকভেদে আর্থিক অবস্থা, আমানতের চাহিদা, তহবিলের ব্যয়, গ্রাহকের ধরন ও আমানতের মেয়াদ অনুযায়ী সুদের হারে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক তুলনামূলক বেশি সুদ দিলেও শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের অনেক আমানত প্রকল্পে হার এখনো তার চেয়ে কম। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে সামগ্রিকভাবে আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংকভেদে সুদের হারের বৈচিত্র্য—দুই দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতির চাপে আমানত সংগ্রহের লড়াই। গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয়ের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের আয় থেকে সঞ্চয়ের জন্য অর্থ আলাদা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, যাঁদের হাতে কিছু সঞ্চয় রয়েছে, তাঁরা সেই অর্থের প্রকৃত মূল্য ধরে রাখতে তুলনামূলক লাভজনক বিনিয়োগের সন্ধান করছেন। ফলে ব্যাংকগুলোকে শুধু নতুন আমানত সংগ্রহ করলেই হচ্ছে না; বিদ্যমান আমানত ধরে রাখার জন্যও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে পৌঁছায়। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কিছুটা ওঠানামা করলেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য। এমন পরিস্থিতিতে আমানতের বিপরীতে সুদের হার বাড়ানো ব্যাংকগুলোর জন্য গ্রাহক আকৃষ্ট করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঘোষিত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর আগে জুনে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ছিল; জুলাইয়ে তা কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। নীতি সুদহার উচ্চ পর্যায়ে থাকায় ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করা কিংবা আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে স্বল্পমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি ব্যাংকগুলো সাধারণ আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহে আগ্রহী হচ্ছে। কারণ আমানত ব্যাংকের ঋণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমের প্রধান তহবিলগুলোর একটি। পর্যাপ্ত আমানত না থাকলে ঋণ বিতরণ, ব্যবসায়িক লেনদেন পরিচালনা এবং দৈনন্দিন তারল্য চাহিদা পূরণে চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই গ্রাহকের অর্থ ধরে রাখা ও নতুন আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
ব্যাংকভেদে সুদের হারের পার্থক্য। বর্তমান বাজারে বিভিন্ন ব্যাংকের ঘোষিত সুদের হার ও বিশেষ আমানত প্রকল্পের ভিত্তিতে একটি আনুমানিক চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সাধারণ স্থায়ী আমানতে বার্ষিক সুদের হার প্রায় ৭ দশমিক ৫০ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে থাকতে দেখা যায়। মাঝারি ও নতুন প্রজন্মের কিছু বেসরকারি ব্যাংক গ্রাহক আকৃষ্ট করতে প্রায় ৯ দশমিক ৫০ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ঘোষণা করছে। আবার কিছু দুর্বল ব্যাংক এবং বিশেষ শর্তযুক্ত দীর্ঘমেয়াদি আমানত প্রকল্পে সুদের হার ১১ থেকে ১৩ শতাংশ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি হতে পারে।
তবে এই হারগুলো ব্যাংকিং খাতের নির্ধারিত গড় সুদের হার নয়। এগুলো বিভিন্ন ব্যাংকের ঘোষিত হার ও বিশেষ প্রকল্পের ভিত্তিতে পাওয়া আনুমানিক বাজারচিত্র। আমানতের পরিমাণ, মেয়াদ, হিসাবের ধরন, গ্রাহকের শ্রেণি এবং ব্যাংকের নিজস্ব শর্ত অনুযায়ী প্রকৃত হার পরিবর্তিত হতে পারে। একই ব্যাংকেও তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আমানতের জন্য আলাদা হার নির্ধারিত থাকে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে গ্রাহকের আস্থা, শাখা নেটওয়ার্ক এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল আমানতভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এসব ব্যাংকের সব সময় সর্বোচ্চ সুদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সোনালী, জনতা ও অগ্রণীর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো সাধারণত আমানত সংগ্রহে সুদের পাশাপাশি সেবার মান ও প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতার ওপরও নির্ভর করে। বড় অঙ্কের করপোরেট আমানতের ক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনা বা সমঝোতার ভিত্তিতে ঘোষিত সাধারণ হারের বাইরে ভিন্ন হার নির্ধারিত হতে পারে।
অন্যদিকে, মাঝারি ও নতুন প্রজন্মের কিছু বেসরকারি ব্যাংকের জন্য আমানত সংগ্রহ তুলনামূলক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা, নতুন গ্রাহক তৈরি এবং তহবিলের চাহিদা মেটাতে তারা সাধারণ মেয়াদি আমানত ও বিশেষ সঞ্চয় প্রকল্পে বেশি সুদ দিতে পারে। তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প, মাসিক মুনাফাভিত্তিক আমানত কিংবা নির্দিষ্ট অঙ্কের সঞ্চয় শেষে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা করা হয়।
সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন দুর্বল বা তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকের ক্ষেত্রে। কোনো ব্যাংক যদি বাজারের প্রচলিত হারের তুলনায় অনেক বেশি সুদ ঘোষণা করে, তাহলে তার পেছনে আমানতের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। বেশি সুদ দেওয়া নিজে কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; তবে অস্বাভাবিক উচ্চ হার ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের চাপ সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাই শুধু মুনাফার অঙ্ক দেখে আমানত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর চাহিবামাত্র ও মেয়াদি আমানতের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৩২ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ লাখ ৪ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আলোচ্য পরিসংখ্যানে আন্তঃব্যাংক ও সরকারি আমানত অন্তর্ভুক্ত নয়।
আমানতের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মেয়াদি আমানত বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে, চাহিবামাত্র উত্তোলনযোগ্য আমানত বেড়েছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি। এতে বোঝা যায়, ব্যাংকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ জমা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। তুলনামূলক বেশি সুদ পাওয়ার সুযোগ, ভবিষ্যৎ ব্যয়ের জন্য সঞ্চয় এবং অর্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন—এসব বিষয় এ প্রবণতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। তবে মেয়াদি আমানত বেড়েছে বলেই সব গ্রাহক দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের ওপর সমানভাবে আস্থা ফিরে পেয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। আমানত বৃদ্ধির পেছনে সুদের হার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকভেদে গ্রাহকের পছন্দ এবং অন্যান্য বিনিয়োগের সুযোগও কাজ করে। তাই এ পরিসংখ্যানকে আমানত সংগ্রহের ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখা গেলেও ব্যাংকিং খাতের সব সমস্যার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
সুদের হার বাড়ার পেছনে আরও যেসব কারণ। ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় অন্যতম পরিবর্তন এসেছে সুদ নির্ধারণের ব্যবস্থায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের মে মাসে ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্মার্ট বা ছয় মাসের গড় ট্রেজারি বিলভিত্তিক সুদ নির্ধারণব্যবস্থা প্রত্যাহার করে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে ঋণের সুদ নির্ধারণে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক, তহবিলের চাহিদা এবং বাজারের পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে স্মার্ট ব্যবস্থা প্রত্যাহারের বিষয়টি মূলত ঋণ ও বিনিয়োগের সুদ নির্ধারণসংক্রান্ত; আমানতের সুদের সব হার একইভাবে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে পরিবর্তিত হয়েছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না।
ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতায় সরকারি সঞ্চয়পত্রও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। ২০২৬ সালের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে বিনিয়োগের অঙ্কভেদে হার ১১ দশমিক ৮০ থেকে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে তা ১১ দশমিক ৭৭ থেকে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। ফলে যোগ্যতা, বিনিয়োগসীমা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে পারলে অনেক আমানতকারীর কাছে সঞ্চয়পত্র ব্যাংকের আমানতের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধনের চাহিদা ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজন বাড়াতে পারে। আমদানি ব্যয়, কাঁচামালের দাম, উৎপাদন খরচ ও বিনিময় হারের পরিবর্তন ব্যবসায়িক অর্থায়নের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। তবে আমানত বাড়লেও ঋণের চাহিদা একই হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং ২০২৬ সালের আগস্টে ব্যাংক আমানত প্রায় ১২ শতাংশ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থ জমা বাড়লেও তা উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে সমান গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে না।
ডিজিটাল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারও আমানত সংগ্রহের ধরন বদলে দিচ্ছে। গ্রাহক এখন শাখায় না গিয়েও হিসাব খোলা, অর্থ স্থানান্তর এবং বিভিন্ন সঞ্চয়সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য শহরের বাইরে নতুন আমানতকারী তৈরি করার সুযোগ বাড়ছে। তবে ডিজিটাল সেবার বিস্তারকে শুধু উচ্চ সুদের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা ঠিক নয়; সহজ লেনদেন, দ্রুত সেবা, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাও গ্রাহক আকৃষ্ট করার বড় উপাদান।
আমানতকারীর প্রকৃত প্রাপ্তি কতটা? ঘোষিত সুদের হার দেখে অনেক আমানতকারী আকৃষ্ট হলেও প্রকৃত আয় নির্ধারিত হয় কর, শুল্ক, হিসাব পরিচালন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনার পর। ব্যাংক যে হারে সুদ ঘোষণা করে, গ্রাহক সাধারণত সেই পুরো অর্থ হাতে পান না। প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সুদের ওপর উৎসে কর কাটা হতে পারে। এ ছাড়া হিসাবের ধরন ও জমার পরিমাণ অনুযায়ী আবগারি শুল্ক এবং ব্যাংকের নির্ধারিত সেবা-সংক্রান্ত চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। করের হার ও ছাড়ের শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে; তাই পুরোনো কোনো নির্দিষ্ট হারকে সবার ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়ম ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এখানে প্রকৃত সুদের হার বা বাস্তব মুনাফার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ধরা যাক, কোনো আমানতে বার্ষিক সুদ ১০ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি প্রায় ৮ শতাংশের বেশি থাকে, তাহলে কর ও অন্যান্য কর্তন বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে লাভ অনেক কমে যেতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবে টাকার অঙ্ক বাড়লেও সেই অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় খুব বেশি পণ্য বা সেবা কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই আমানতকারীর উচিত ঘোষিত সুদের হার নয়, কর-পরবর্তী প্রকৃত আয় এবং মূল্যস্ফীতির তুলনায় সেই আয়ের অবস্থান বিবেচনা করা।
অন্যদিকে, উচ্চ সুদের প্রস্তাব দেওয়া ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও যাচাই করা জরুরি। ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলার সক্ষমতা আমানতের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু বেশি সুদ দেওয়ার কারণে কোনো ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যায় না; আবার বেশি সুদের প্রস্তাবকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবেও দেখা যায় না। বিশেষ করে বড় অঙ্কের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যাংকের তহবিল ব্যয় ও বিনিয়োগে প্রভাব। আমানতের সুদের হার বাড়লে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয়ও বাড়ে। ব্যাংককে আমানতকারীদের সুদ দেওয়ার পাশাপাশি কর্মী, শাখা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে উচ্চ সুদে সংগৃহীত আমানত থেকে লাভজনক ঋণ ও বিনিয়োগ করতে না পারলে ব্যাংকের মুনাফায় চাপ তৈরি হয়।
ব্যাংক সাধারণত আমানতের বিপরীতে সুদ প্রদান করে এবং ঋণ বা বিনিয়োগ থেকে আয় করে। এ দুইয়ের ব্যবধানকে সুদ-ব্যবধান বলা হয়। আমানতের ব্যয় দ্রুত বাড়লেও ঋণ থেকে আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে ব্যাংকের নিট সুদ আয় ও মুনাফা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, তহবিলের ব্যয় সামাল দিতে ঋণের সুদ বেশি বাড়ালে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ পড়ে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে উচ্চ আমানত সুদ মানেই ঋণের সুদ অনিবার্যভাবে একই অনুপাতে বাড়বে—এমন নয়। ব্যাংকের দক্ষতা, পরিচালন ব্যয়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, কম খরচের আমানতের অংশ এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতার ওপরও বিষয়টি নির্ভর করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের জুনে ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদের ব্যবধান নির্দিষ্ট সীমায় রাখার নির্দেশনা দেয়। ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে এ ব্যবধান ৪ শতাংশের বেশি না রাখার নির্দেশ কার্যকর হয় ২৯ জুন থেকে। এ পদক্ষেপের লক্ষ্য ঋণের সুদকে সহনীয় রাখা এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা।
দীর্ঘমেয়াদে শুধু বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহের কৌশল টেকসই নয়। ব্যাংকগুলোর উচিত গ্রাহকের আস্থা, সেবার মান ও আর্থিক স্বচ্ছতাকে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রাখা। গ্রাহকের বয়স, আয়, সঞ্চয়ের লক্ষ্য ও আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা, চিকিৎসা, অবসর কিংবা জরুরি প্রয়োজনের জন্য উপযোগী সঞ্চয় প্রকল্প তৈরি করা যেতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যমে সহজে হিসাব খোলা, আমানতের মেয়াদ ও মুনাফা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া এবং মেয়াদ শেষে অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করাও জরুরি।
ব্যাংকগুলোর কম খরচের আমানত বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। চলতি হিসাব ও সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের আমানত তুলনামূলক কম ব্যয়ে তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করে। এ ধরনের আমানত বাড়াতে লেনদেনের সুবিধা, দ্রুত সেবা, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকেরও দায়িত্ব রয়েছে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। কোনো ব্যাংক যাতে আর্থিক সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ না করে, সে বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের তারল্য, মূলধন ও খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকের আর্থিক তথ্য প্রকাশ, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং আমানত সুরক্ষাসংক্রান্ত বিধিব্যবস্থা কার্যকর রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতি, সরকারি সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ এবং ব্যাংকভেদে তারল্যের পার্থক্য এ প্রতিযোগিতাকে তীব্র করেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে আমানতের ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ জমার ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। তবে একই সময়ে মেয়াদি আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়া এবং বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকা অর্থের ব্যবহার ও বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
আমানতকারীদের জন্য বেশি সুদ পাওয়ার সুযোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু অর্থের নিরাপত্তা, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, কর-পরবর্তী প্রকৃত মুনাফা এবং অর্থ উত্তোলনের শর্ত বিবেচনা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর জন্যও উচ্চ সুদের মাধ্যমে সাময়িকভাবে আমানত বাড়ানোর চেয়ে স্থিতিশীল তহবিলভিত্তি, সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বেশি জরুরি।
সুদের প্রতিযোগিতা তখনই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে, যখন তা ব্যাংকিং সেবার মান বাড়াবে, আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং সংগৃহীত অর্থকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করবে। অন্যথায় উচ্চ সুদের এই প্রতিযোগিতা ব্যাংকের ব্যয় বাড়িয়ে ঋণগ্রহীতা, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুদের হারনির্ভর প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আর্থিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

