বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাত আজ গভীর কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, ভুয়া নথি তৈরি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতের ভিত দুর্বল হয়েছে। এর পরিণতিতে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে, প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে, তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুন প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের বিপরীতে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
তবে এই পরিসংখ্যানের চেয়েও উদ্বেগজনক হলো ঋণ জালিয়াতির ধরন। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ, জমির জাল দলিল, অতিমূল্যায়িত সম্পদ, ভুয়া আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং মিথ্যা ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকের বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ এখন একাধিক অনুসন্ধান ও মামলায় উঠে এসেছে। ফলে সংকটটি আর শুধু ঋণ আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আর্থিক অপরাধ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি: সাম্প্রতিক মামলায় নতুন উদ্বেগ। ব্যাংকঋণ জালিয়াতির ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে ২০২৬ সালের ২ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, তাঁর ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনতা ব্যাংকের ১ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তিনটি মামলা দায়েরের উদ্যোগ নেয় কমিশন। মামলাগুলোতে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণ ও রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের ঢাকা স্থানীয় কার্যালয় থেকে স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস, আরবান ফ্যাশনস এবং মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসের নামে ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়।
কমিশনের হিসাবে, স্প্রিংফুল অ্যাপারেলসের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, আরবান ফ্যাশনসের মাধ্যমে ৪১৭ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসের মাধ্যমে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ভুয়া বাণিজ্যিক লেনদেন, কৃত্রিম বিল এবং ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে অর্থের অপব্যবহার ও বিদেশে পাচারের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। তিনটি মামলায় পৃথকভাবে ২২, ২২ ও ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংকের পাবনা শাখায় ‘জামান সিন্ডিকেট’ নামের একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪৫ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ হাজার ৮ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছিল। একই অনুসন্ধানে নাবিল গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও সামনে আসে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি জাতীয় ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে নেওয়া ঋণসংক্রান্ত মামলায় ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্পের ভুয়া নির্মাণকাজের চুক্তিপত্র ব্যবহার করে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। মামলায় ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জনতা ব্যাংকের আননটেক্স গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমান, সাবেক জনতা ব্যাংক চেয়ারম্যান আবুল বারাকাতসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে ২৯৭ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। তদন্তে বন্ধক রাখা জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগও উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে কমিশন অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করে।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট—ঋণ অনুমোদনের আগে প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, সম্পদের মালিকানা এবং জামানতের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্বলতা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ভুয়া নথির কৌশল: কীভাবে ব্যাংকের অর্থ বেরিয়ে যায়? ব্যাংকঋণ জালিয়াতির পদ্ধতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কেবল জাল দলিল তৈরি করেই নয়, বরং একাধিক প্রতিষ্ঠান, কৃত্রিম ব্যবসায়িক লেনদেন এবং আর্থিক নথির সমন্বয়ে ঋণ অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমত, অস্তিত্বহীন বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়। কাগজে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, পরিচালকদের পরিচয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আর্থিক বিবরণী থাকলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রম নাও থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জমির মালিকানা ও দলিলসংক্রান্ত জালিয়াতি করা হয়। অন্যের জমি নিজের নামে দেখানো, জাল খতিয়ান তৈরি, একই জমি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রাখা কিংবা জমির বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয়ত, আমদানি-রপ্তানির নামে ভুয়া ঋণপত্র, চালান, বিল অব এন্ট্রি এবং বাণিজ্যিক চুক্তি ব্যবহার করা হয়। প্রকৃত পণ্য আমদানি বা রপ্তানি না করেও কাগজে লেনদেন দেখিয়ে অর্থ ছাড় করানো সম্ভব হলে সেই অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করে মূল উৎস আড়াল করা হয়।
চতুর্থত, প্রকল্পের নামে ভুয়া চুক্তিপত্র ব্যবহার করা হয়। সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পের উপঠিকাদারির কাগজ দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। পঞ্চমত, প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নকল স্বাক্ষর, পরিবর্তিত ব্যাংক বিবরণী, ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি তৈরি করা আগের তুলনায় সহজ হতে পারে। তবে বাংলাদেশে ব্যাংকঋণ জালিয়াতিতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা ঘটেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই ব্যাংকগুলোর নথি যাচাইয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বাধীন তথ্যসূত্রের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি: দুর্বল হচ্ছে ব্যাংকের আর্থিক ভিত। খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রভিশন ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬ প্রান্তিকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ১৫টি ব্যাংকে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী যে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়, তা পূরণ করতে না পারায় এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
প্রভিশন ঘাটতি কোনো সাধারণ হিসাবের সমস্যা নয়। এর অর্থ, সম্ভাব্য ঋণক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় আর্থিক সঞ্চিতি অপর্যাপ্ত। ফলে ব্যাংকের মুনাফা, মূলধন এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ে। তবে প্রভিশন ঘাটতিকে সরাসরি আমানতকারীদের অর্থ হারিয়ে যাওয়ার সমার্থক ভাবা ঠিক নয়; এটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকে এর পরিমাণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংকে ১৯ হাজার ২৮১ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকে ১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। বাকি দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক—বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনাদায়ি ঋণ রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই চিত্রের পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতেও খেলাপি ঋণের ভয়াবহ কেন্দ্রীভবন লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, কয়েকটি ব্যাংকের দীর্ঘদিনের ঋণ অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আদায় ব্যর্থতা এখন সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
সুশাসনের অভাব ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা। ব্যাংক খাতের সংকটের পেছনে শুধু ঋণগ্রহীতাদের অনিয়ম দায়ী নয়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা, ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংককে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ পূরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের যাচাই থাকার কথা। শাখা, প্রধান কার্যালয়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নিরীক্ষা বিভাগ এবং পরিচালনা পর্ষদ—প্রতিটি পর্যায়ের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বড় ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় এসব স্তরের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে বারবার বিশেষ সুবিধা, কম অগ্রিম অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ এবং দুর্বল ঋণের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার প্রবণতা ব্যাংকিং শৃঙ্খলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়িক সমস্যায় থাকা প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে একই সুবিধা প্রয়োগ করলে তা অনিয়মকে উৎসাহিত করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও কার্যকর তদারকিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপের বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমানতকারীদের আস্থা ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব। ব্যাংকিং সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। কারণ ব্যাংকের ঋণ বিতরণের মূল অর্থের একটি বড় অংশ আসে জনগণের আমানত থেকে। কোনো ঋণগ্রহীতা জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ নিয়ে গেলে এবং তা ফেরত না দিলে ব্যাংকের তারল্য ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
দুর্বল ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে ব্যাংকের ওপর চাপ আরও বাড়ে। কোনো কোনো ব্যাংকে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে বিলম্ব হওয়ার ঘটনাও আস্থার সংকটকে গভীর করে।
এর প্রভাব শুধু আমানতকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কৃষি খাত এবং নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। একে অর্থনীতির ভাষায় ঋণ স্থানচ্যুতি বলা হয়। উচ্চ সুদহার ও সীমিত ঋণপ্রবাহ বিনিয়োগের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
সংকটের আর্থিক মূল্য সম্পর্কে ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ প্রস্তাবটি পূর্ণ মেয়াদে বাস্তবায়িত হলে পাঁচ বছরে ৩ লাখ কোটি থেকে আট বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সরকারি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এটি গভর্নরের উত্থাপিত প্রয়োজনীয়তা ও প্রস্তাব; অনুমোদিত বাজেট বরাদ্দ নয়।
ইতিমধ্যে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংককে তারল্য সহায়তাও দিয়েছে। তবে এসব সহায়তার পাশাপাশি আর্থিক দায় নির্ধারণ ও প্রকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত না হলে শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থের ওপরই অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
উত্তরণে প্রয়োজন কাঠামোগত ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার। ব্যাংক খাতকে সংকট থেকে বের করে আনতে সাময়িক তারল্য সহায়তা কিংবা ঋণ পুনঃতফসিল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার। প্রথমত, একটি স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন বা শক্তিশালী তদন্ত কাঠামোর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদ, দায়, খেলাপি ঋণ ও অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করতে হবে। প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে পাচার করা অর্থসহ আত্মসাৎ করা সম্পদ পুনরুদ্ধারে বিশেষায়িত সম্পদ পুনরুদ্ধার ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ঋণ অনুমোদনের আগে জমির মালিকানা, দলিল, খতিয়ান ও বন্ধকসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রাখা ঠেকাতে কেন্দ্রীয় জামানত তথ্যভান্ডার কার্যকর করা জরুরি।
চতুর্থত, ঋণের অর্থ ছাড়ের পর তার প্রকৃত ব্যবহার যাচাই করতে হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরীক্ষা, প্রকল্প পরিদর্শন এবং অর্থের লেনদেন পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কেবল জামানতের মূল্য নয়, প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পঞ্চমত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বার্থের সংঘাত, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান এবং পরিচালকদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রভাবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ষষ্ঠত, ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার, নিরীক্ষক ও মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। তবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া হতে হবে নিরপেক্ষ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াভিত্তিক। একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতি ও ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির মধ্যে পার্থক্য রাখতে হবে। সপ্তমত, যেসব ব্যাংক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছ পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা প্রয়োজন হলে নিয়মতান্ত্রিক অবসায়নের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে কোনো ব্যাংক একীভূত করলেই তার পুরোনো অনিয়মের দায় মুছে যায় না। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে জামানতের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের জন্য ১৩১টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি বড় ঋণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাইয়ের প্রস্তাবও সামনে এসেছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ঋণ জালিয়াতির সুযোগ কমতে পারে।
আমানতের নিরাপত্তায় জবাবদিহির বিকল্প নেই। ব্যাংকিং খাতের সংকট কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। ভুয়া নথির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যাওয়া, খেলাপি ঋণের পাহাড়, প্রভিশন ঘাটতি এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতা—সবকিছু মিলিয়ে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের দায় কেবল ঋণগ্রহীতার ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত সমাধান আসবে না। ঋণ অনুমোদন থেকে অর্থ ছাড়, ব্যবহার, নিরীক্ষা এবং আদায়—প্রতিটি পর্যায়ে কার কী দায়িত্ব ছিল, তা নির্ধারণ করতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার মধ্যে আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ ব্যাংকের অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের আমানত, দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগের চালিকাশক্তি।
ভুয়া নথিতে হাজার কোটি টাকা পার হওয়ার প্রতিটি ঘটনা তাই শুধু আর্থিক জালিয়াতি নয়, রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা ও জনগণের আস্থার ওপর আঘাত। এখন প্রয়োজন দায়ীদের আইনের আওতায় আনা, লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা। অন্যথায় খেলাপি ঋণের পাহাড় আরও বড় হবে, আর্থিক খাতের রক্তক্ষরণ থামবে না এবং এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে সাধারণ আমানতকারী ও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে।

