একদিকে রেকর্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য, অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট; খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনে প্রশ্নের মুখে আমানতকারীদের নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এমন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অর্থের স্বল্পতার চেয়ে অর্থের সুষ্ঠু বণ্টন, ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংকে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ সরবরাহ করতে হিমশিম খাওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোথাও গ্রাহকেরা সঞ্চয় তুলে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন, কোথাও ব্যাংকগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র না পেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখছে। এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে দাঁড়িয়ে ব্যাংকিং খাতের এই বাস্তবতা শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ বিতরণে দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের বিস্তার, মূলধন ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার প্রবণতা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের সংকট এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার আর্থিক অবস্থাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
আমানতকারীদের অনাস্থা ও টাকা তোলার প্রবণতা। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো আমানতকারীদের বিশ্বাস। একজন গ্রাহক যখন ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন, তখন তিনি প্রত্যাশা করেন, প্রয়োজনের সময় কোনো বাধা ছাড়াই সেই অর্থ ফেরত পাবেন। কিন্তু কোনো ব্যাংকে অর্থ উত্তোলনে বিলম্ব, নগদ অর্থের সীমাবদ্ধতা কিংবা পরিচালনাগত সমস্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রাহকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্যসংকট আমানতকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে সব শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। এর পর ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের নিশ্চয়তায় ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেয়। ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটি নিয়মিতভাবে আমানত উত্তোলনের কার্যক্রম চালু করে।
এ ঘটনা ব্যাংকিং খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা যখন গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, তখন সেটি আর শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না; তা সরাসরি জনআস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়।
আমানতকারীদের মধ্যে এই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অতীতে বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং ঋণখেলাপির ঘটনা প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যাংকে টাকা উত্তোলনে সমস্যা হলে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও সতর্ক হয়ে ওঠেন। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক আরও বাড়ে।
এখানে মনস্তাত্ত্বিক একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনেক সময় গ্রাহকেরা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চেয়ে ভবিষ্যতে অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হন। অর্থাৎ ব্যাংকটি আজ টাকা দিতে পারলেও আগামীকাল পারবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা থেকেই ব্যাপক অর্থ উত্তোলনের সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে।
উদ্বৃত্ত তারল্যের মধ্যেও নগদ অর্থের সংকট কেন? দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—একদিকে উদ্বৃত্ত তারল্য, অন্যদিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট তারল্য দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিধিবদ্ধ ন্যূনতম তারল্যের প্রয়োজন ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।
এই পরিমাণকে ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান দেখে দেশের প্রতিটি ব্যাংক আর্থিকভাবে স্বচ্ছন্দ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ভুল হবে। কারণ, উদ্বৃত্ত তারল্য পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্মিলিত হিসাব। এই অর্থ সব ব্যাংকের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত নয়। আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল অর্থ থাকলেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের ঘাটতি থাকতে পারে। ফলে একটি ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের আমানতকারীদের তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণ করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া ব্যাংকের মোট সম্পদের সবটুকু নগদ অর্থ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে না। আমানতের একটি অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়, অন্য অংশ সরকারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও বিভিন্ন আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়। এসব বিনিয়োগ থেকে অর্থ ফেরত পেতে সময় প্রয়োজন হতে পারে। অথচ আমানতকারী যখন অর্থ উত্তোলন করতে চান, তখন ব্যাংককে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়। অর্থাৎ বর্তমান সংকটের একটি বড় অংশ তারল্যের পরিমাণে নয়, বরং তারল্যের অসম বণ্টন এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনায় নিহিত।
বিনিয়োগে স্থবিরতা ও অলস অর্থের বিস্তার। ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদার দুর্বলতা। ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করলেও প্রত্যাশিত হারে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক ঋণ বিতরণ করতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অন্যদিকে আগস্টে ব্যাংক আমানতের বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ আমানত বৃদ্ধির তুলনায় ঋণ সম্প্রসারণের গতি অনেক কম।
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতির চাপ, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এবং নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের সতর্ক অবস্থান ব্যবসায়িক ঋণের চাহিদা কমিয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের উচ্চ ঝুঁকির কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে অধিক সতর্ক হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে ঝুঁকছে। এতে সরকারি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হলেও বেসরকারি খাতে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ জমা হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং দুর্বলতার সবচেয়ে বড় উৎস। দেশের ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকটের গভীরে রয়েছে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বিস্তার। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রতি বিশেষ সুবিধা, দুর্বল জামানত যাচাই এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুন প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই খেলাপি ঋণের বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। ২০২৬ সালের জুন শেষে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ জমা ছিল। ফলে ব্যাংকিং খাতের সমস্যাটি শুধু ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির নয়, বরং ঋণ বিতরণে ঝুঁকির অসম বণ্টনেরও প্রতিফলন।
খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের আয় কমে যায়। কারণ, ঋণ থেকে প্রত্যাশিত সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। এতে ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে এবং মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। কোনো ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিপুল লোকসান বা প্রভিশন ঘাটতির তথ্য সামনে এলে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এভাবেই খেলাপি ঋণের সমস্যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের আস্থার সংকটেও রূপ নেয়।
মূলধন ঘাটতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত। ব্যাংক কোনো ঋণ বা বিনিয়োগে ক্ষতির মুখে পড়লে মূলধন সেই ক্ষতি সামাল দেওয়ার সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের লোকসান ও অনাদায়ি ঋণের কারণে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়ে গেলে আমানতকারীদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ২৪ জুন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। এই পরিস্থিতি শুধু কয়েকটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনেও কয়েকটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংকের কারণে পুরো খাতের মূলধন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।
আমানত সুরক্ষা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ। ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ পাস হয়। নতুন আইনে প্রত্যেক আমানতকারীর জন্য সর্বোচ্চ সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্থ কোনো সদস্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হলে আইন অনুযায়ী সুরক্ষা তহবিল থেকে পরিশোধের আওতায় আসবে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ২ লাখ টাকার সুরক্ষা মানে প্রত্যেক আমানতকারীর সব আমানত শতভাগ নিরাপদ—এমন নয়। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থের ক্ষেত্রে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং আর্থিক তদারকি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে বাংলাদেশকে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪৫ কোটি ডলার) ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির বোর্ড অব এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরস ২০২৬ সালের ২৪ জুন অর্থায়ন প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে ৩০ অক্টোবর বা ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ নামের এই উদ্যোগের আওতায় আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং জরুরি তারল্য সহায়তার কাঠামো উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়ন করবে। অর্থায়নটির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ব্যাংকিং খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তবে অর্থায়ন অনুমোদনই সংস্কারের সফলতার নিশ্চয়তা নয়। এর কার্যকর ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নের ওপরই এর ফলাফল নির্ভর করবে।
প্রয়োজন দায়বদ্ধতা ও কাঠামোগত সংস্কার। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণকারী এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন ও পুনঃতফসিলের সুযোগ রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠা জরুরি। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা স্বার্থের সংঘাতের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি বড় ঋণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জামানতের বাস্তব মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণে স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন। কোন ব্যাংকের কত মূলধন ঘাটতি, কত ঋণ আদায়যোগ্য এবং কত অর্থ প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। প্রয়োজনে আর্থিকভাবে অকার্যকর ব্যাংক পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা সুশৃঙ্খল অবসায়নের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমানতকারী, কর্মী ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। ব্যাংকের অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর দীর্ঘসূত্রতা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, পেশাদারত্ব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পঞ্চমত, ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যের নিরাপদ আদান-প্রদান এবং নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব। তবে শুধু ব্লকচেইন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই ঋণ জালিয়াতি বন্ধ হবে না; কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক জবাবদিহির বিকল্প নেই।
সবশেষে, ব্যাংকগুলোর গ্রাহকসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সমস্যা দেখা দিলে গ্রাহকদের কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। এটিএম, শাখা ও ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গুজবের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রবাহ বাড়ানোই আতঙ্ক কমানোর কার্যকর উপায়।
অর্থের চেয়ে বড় সংকট বিশ্বাসের। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে—কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা শুধু তার হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই অর্থের মান, বণ্টন, ঋণ আদায়ের সক্ষমতা, মূলধনের শক্তি এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য এবং একই বছরের জুন শেষে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ—এই দুটি পরিসংখ্যান একসঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতের বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। একদিকে অর্থ জমে আছে, অন্যদিকে বিপুল অর্থ অনাদায়ি হয়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে। তাই শুধু নতুন অর্থ সরবরাহ করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করতে হলে প্রথমে অর্থের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে, ঋণ আদায়ের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো গ্রাহক নিজের সঞ্চয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় না ভোগেন। সাধারণ আমানতকারীদেরও যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য আর্থিক তথ্য ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা বিবেচনা করা উচিত। তবে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান দায়িত্ব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের প্রতি মানুষের বিশ্বাস একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। তাই ব্যাংক রক্ষার নামে অনিয়মকে আড়াল করা নয়, বরং অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করেই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংকিং খাতকে এমন একটি অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে মানুষের সঞ্চয় নিরাপদ থাকবে, উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাবেন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। কারণ, ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি তার ভল্টে জমা অর্থ নয়; সেই অর্থের ওপর মানুষের অবিচল আস্থা।

