বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এমন এক আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মূল্য দিতে হচ্ছে পুরো অর্থনীতিকে। ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে ক্রমেই দুর্বল করেছে।
একসময় যেসব ব্যাংক দেশের শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের প্রধান অর্থায়নকারী ছিল, সেগুলোর একটি অংশ এখন নিজেদের আর্থিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে প্রায় এক ডজন ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, বিপুল মূলধন ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য শুধু ঋণ আদায়ের ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, মূলধন সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও প্রকাশ করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের বড় অংশ অল্পসংখ্যক ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ১০টি ব্যাংকের কাছে মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। ফলে ব্যাংকিং খাতের সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
খেলাপি ঋণ থেকে মূলধন ক্ষয়: সংকটের অন্তর্নিহিত চিত্র। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত। এই অনুপাত নির্দেশ করে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকের নিজস্ব কতটুকু মূলধন রয়েছে এবং সম্ভাব্য লোকসান মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি কতটা সক্ষম। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড বাসেল-৩ অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের শর্ত পূরণ করা প্রতিটি ব্যাংকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সাধারণ ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার শর্ত ১০ শতাংশ; মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ প্রয়োজনীয় মাত্রা আরও বেশি।
কিন্তু দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক মূলধন পরিস্থিতি এখন এই মানদণ্ডের অনেক নিচে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ২১টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর মূলধন উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি সমন্বয়ের পর পুরো ব্যাংকিং খাতের নিট মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতও ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মূলধন পরিস্থিতি আরও অবনতির বিভিন্ন ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চের মূলধন পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো।
মূলধন ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করতে না পারা। কোনো ঋণ অনাদায়ী হয়ে গেলে ব্যাংককে তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। এই অর্থ ব্যাংকের আয় থেকে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হলে মুনাফা কমে যায়, লোকসান বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিজস্ব মূলধন ক্ষয় হতে থাকে।
এখানে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন ঘাটতি পৃথক হলেও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে; প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়; আর দীর্ঘস্থায়ী লোকসান মূলধনকে আরও ক্ষয় করে।
সংকটের কেন্দ্রে এক ডজন ব্যাংক। ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বিশেষভাবে নাজুক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি এবং ইসলামী ধারার ব্যাংক—সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই এই দুর্বলতা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের জুন শেষে প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির এমন অবনতি ব্যাংকটির ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পরিস্থিতিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ থেকেই নিয়মিত অর্থ ফেরত আসছে না।
অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের ঋণমানের অবনতিও ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
মূলধন ঘাটতির ক্ষেত্রে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকের ৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ২৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই হিসাব থেকে স্পষ্ট, কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা এতটাই গভীর যে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুশাসনের অভাব ও ঋণ কেন্দ্রীভবনে বিপর্যয়। ব্যাংকিং খাতের এই দুরবস্থার পেছনে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অনিয়ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ গুরুত্ব পাওয়ায় ব্যাংকের স্বাভাবিক ঋণশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
একটি ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণগ্রহীতার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই, ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা। কিন্তু এসব মৌলিক শর্ত উপেক্ষা করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের ফলে অনেক ব্যাংক নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ গ্রহণ। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন ব্যাংকিং নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৯৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এই অর্থের বড় অংশই ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছিল। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠে আসে।
একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে বিপুল পরিমাণ ঋণ কেন্দ্রীভূত হলে ব্যাংকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সংকট তৈরি হলে কিংবা অর্থ ফেরত বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকের বড় অংশের সম্পদ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে। এতে শুধু ঋণ আদায় ব্যাহত হয় না, ব্যাংকের নগদ অর্থপ্রবাহ ও মূলধন কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব, স্বার্থের সংঘাত, ঋণের অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তর এবং একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু ঋণ আদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রভিশন ঘাটতি: ব্যাংকের আর্থিক নিরাপত্তায় বড় ফাটল। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে না পারা ব্যাংকিং খাতের আরেকটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুন প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
এই ঘাটতির অর্থ হলো, ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পুরোপুরি সংরক্ষণ করতে পারেনি। এতে ব্যাংকের ঘোষিত মুনাফা ও প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মোট ঋণের অধিকাংশ, সেগুলোর জন্য প্রভিশন সংরক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করতে গেলে ব্যাংকের আয় কমে যায়। আবার পর্যাপ্ত আয় না থাকলে মূলধন থেকে ক্ষতি সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধন সংকট একটি চক্রাকার সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
অর্থঋণ আদালতে আটকে বিপুল অঙ্কের অর্থ। ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য মামলা করলেও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা অর্থ পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৪১টি মামলায় প্রায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা আটকে থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
মামলার সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় এটি শুধু বিচারিক জট নয়; বরং ব্যাংকগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপরও বড় চাপ। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগায় বন্ধক রাখা সম্পদ বিক্রি, ঋণগ্রহীতার সম্পদ শনাক্ত এবং বকেয়া অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সব খেলাপি ঋণকে একইভাবে বিবেচনা করাও যুক্তিসংগত নয়। কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসায়িক ক্ষতি, বাজারের মন্দা কিংবা বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিকূলতার কারণে সাময়িকভাবে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে ঋণের অর্থ সরিয়ে নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হন। এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ঋণ সংকোচন ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি চাপ। ব্যাংকগুলোর মূলধন দুর্বল হয়ে পড়লে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত হয়। কারণ মূলধন পর্যাপ্ততার শর্ত পূরণ না হলে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে যেসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও ব্যবসা খাতে অর্থায়ন করে আসছে, সেগুলোর ঋণ সক্ষমতা কমে গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কার্যকরী মূলধনের অভাবে কারখানার কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মী নিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
এদিকে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমের দুর্বলতা তাদের আয়ের ওপরও প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ২৭টি ব্যাংকের সম্মিলিত নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ৫ হাজার ৬২৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ইতিবাচক ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
গত অন্তত ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো এই ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট সুদ আয় ঋণাত্মক হয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে সুদ আদায় কমে যাওয়া, নতুন ঋণ বিতরণে দুর্বলতা এবং আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয়ের চাপ এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। এটি ব্যাংকগুলোর প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস ঋণ থেকে অর্জিত সুদ। সেই আয় কমে গেলে শুধু মুনাফাই নয়, ভবিষ্যৎ মূলধন গঠনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমানতকারীদের আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। ব্যাংকিং খাতের সংকটের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো আমানতকারীদের আস্থা। একটি ব্যাংক যত বড়ই হোক, আমানতকারীরা যদি মনে করেন সেখানে তাদের অর্থ নিরাপদ নয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত প্রত্যাহার করে তুলনামূলক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের প্রবণতা তৈরি হলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে তারল্যের অসম বণ্টন দেখা দেয়। একদিকে কিছু ব্যাংক আমানতের চাপ সামলাতে পারে না, অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমা হতে পারে। এখানে মনে রাখতে হবে, মূলধন সংকট ও তারল্যসংকট এক নয়। মূলধন হলো লোকসান বহনের আর্থিক ভিত্তি, আর তারল্য হলো তাৎক্ষণিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা। তবে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও আস্থাহীনতা একসঙ্গে তৈরি হলে তারল্যঝুঁকিও বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তা সাময়িকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর লেনদেন সচল রাখতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কোনো ব্যাংকের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বরং এতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সিটি গ্রুপকে নতুন ঋণ: বাস্তবতা ও নীতিগত বিতর্ক। ব্যাংকিং খাতের সংকটের মধ্যেই ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে সিটি গ্রুপের পাঁচটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে চলতি মূলধন ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ নভেম্বর ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭কক(৩) ধারার বিধান থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়। এর ফলে সিটি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে আটটি ব্যাংকের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাংকগুলো ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই সুবিধা ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
সিটি গ্রুপের ঋণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেশের ভোগ্যপণ্য সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও আটা-ময়দার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রাখার যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঋণের বিপরীতে দায়মুক্ত সম্পদ বন্ধক রাখা, নির্দিষ্ট হিসাবে বিক্রয়লব্ধ অর্থ জমা এবং সেখান থেকে ব্যাংকের পাওনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধের মতো শর্তও রাখা হয়েছে।
নীতিগতভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি থাকতে পারে। কোনো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও বাজারদরে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অন্য ঋণগ্রহীতাদের জন্য ভুল বার্তা তৈরি হতে পারে। অতএব, বিশেষ সুবিধা যেন কোনোভাবেই ঋণখেলাপির দায় এড়ানোর পথ না হয়। বরং উৎপাদন সচল রাখা, নতুন ঋণের অর্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পুরোনো ঋণ আদায়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে।
ব্যাংক পুনর্গঠনে একীভূতকরণই শেষ কথা নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে একীভূতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটি নিজে কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ ব্যাংক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
তবে একাধিক দুর্বল ব্যাংক একত্র করলেই তাদের খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি কিংবা সুশাসনের সমস্যা দূর হয়ে যায় না। বরং সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, দায় ও সম্ভাব্য লোকসান চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় নতুন মূলধনের ব্যবস্থা না করে একীভূতকরণ করা হলে সংকট আরও কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এ কারণে প্রতিটি ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের স্বাধীন মূল্যায়ন, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সংকট উত্তরণে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধারে প্রথমেই বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদ ও অর্থের গতিপথ অনুসন্ধান করতে হবে। যেসব ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বা ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে দেশে ও বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে সম্পদমান পর্যালোচনা করতে হবে। এতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং প্রয়োজনীয় মূলধনের পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, একটি কার্যকর সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করা যেতে পারে। এই প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট শর্তে অনাদায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ গ্রহণ করে সেগুলোর বিপরীতে অর্থ পুনরুদ্ধারের কাজ করবে। মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ অতীতে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেছে। তবে বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ গ্রহণের আগে স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, স্বাধীন পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ঋণগ্রহীতার রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং নগদ অর্থপ্রবাহ, ব্যবসার সম্ভাব্যতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জামানতের বাস্তব মূল্যকে প্রধান বিবেচনা করতে হবে।
পঞ্চমত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা হলে শুধু ঋণগ্রহীতাকে নয়, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও পরিচালকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ষষ্ঠত, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য দেশের বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়ন পুরোপুরি ব্যাংকঋণনির্ভর থাকলে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়লে ব্যাংকের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কমবে।
আস্থার পুনর্গঠনই হবে ব্যাংক সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটকে কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লোকসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের আর্থিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসন এবং জবাবদিহির অভাবের সম্মিলিত ফল। খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া, বিপুল মূলধন ঘাটতি এবং নিরাপত্তা সঞ্চিতির দুর্বলতা প্রমাণ করছে যে প্রচলিত ব্যবস্থায় আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সমস্যার প্রকৃত মাত্রা স্বীকার করে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন। দুর্বল ব্যাংককে শুধু সরকারি অর্থ কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তায় সচল রাখলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু তাতে ঋণ অনিয়মের সংস্কৃতি দূর হবে না। বরং দায়ীদের জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, মূলধন পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা কিংবা ব্যাংক মালিক যেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের মূলধন শুধু হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এটি আমানতকারীদের সঞ্চয়, ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিরাপত্তাবলয়। এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শিল্প উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে সরকারি অর্থব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ে। তাই এক ডজন ব্যাংকের সংকটকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এখন প্রয়োজন এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে ঋণ বিতরণ হবে নিয়মের ভিত্তিতে, অর্থ ফেরত না দিলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ কোনোভাবেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে পরাজিত হবে না।

