বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি ডলারে। জনসংখ্যার হিসাবে এটি মাথাপিছু প্রায় ৬৪৬ ডলারের সমান। আগের বছরের তুলনায় মোট বকেয়া ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ৫ নভেম্বর প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদন ২০২৬’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশের বৈদেশিক দেনা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে এই ঋণ ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু হিসাব করা হয়েছে ১৭ কোটি ৫৭ লাখ জনসংখ্যা ধরে। তবে এটি প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত দায় নয়, বরং একটি গড় সামষ্টিক অঙ্ক।
মোট ঋণের সিংহভাগই সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত। এর পরিমাণ ৮৯ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি অ-গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। সরকারি ঋণের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থার কাছে দেনা ৫১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে নেওয়া দ্বিপক্ষীয় ঋণ ৩২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি পাওনাদারদের অংশ আরও ৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।
বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার পাওনা সবচেয়ে বেশি, ২২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ১৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, আর অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থার ১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাওনাদার জাপান, ১২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। এরপর রাশিয়া ৯ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য দেশ ১০ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের সূচকে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল রপ্তানি আয়ের ২১০ শতাংশ, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মোট জাতীয় আয়ের তুলনায় ঋণের অনুপাত ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে স্বস্তির তথ্য হলো, ঋণ পরিশোধের ব্যয় তুলনামূলক কমেছে। রপ্তানির বিপরীতে ঋণ পরিশোধের অনুপাত ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। জাতীয় আয়ের বিপরীতে এই হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের স্থূল বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার ছয় দেশের সমন্বিত বৈদেশিক ঋণ ছিল ৯৫৫ বিলিয়ন ডলার। জনসংখ্যা ১৬৯ কোটি ২০ লাখ ধরে অঞ্চলটির মাথাপিছু গড় ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৬৪ ডলার। বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ এই গড়ের চেয়ে বেশি। ছয় দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। এসব দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ২০২৪ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। অঞ্চলটির মোট ঋণ জাতীয় আয়ের ২১ শতাংশের সমান ছিল এবং রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ গেছে ঋণ পরিশোধে।
বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ ভারতের প্রায় ৫২২ ডলার এবং নেপালের ৪০১ ডলারের চেয়ে বেশি। তবে শ্রীলঙ্কার প্রায় ২ হাজার ৬৪৫ ডলার, ভুটানের ৪ হাজার ২১৮ ডলার এবং মালদ্বীপের প্রায় ৮ হাজার ৯৫৭ ডলারের তুলনায় তা অনেক কম। অঞ্চলের মোট ঋণের সিংহভাগ ভারতের, ৭৬৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এরপর আছে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা, যাদের ঋণ যথাক্রমে ১১৩ দশমিক ৪৪ ও ৫৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে ভিন্ন আঞ্চলিক শ্রেণিতে থাকা পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণ ১৩৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। ২৫ কোটি ৫২ লাখ জনসংখ্যার হিসাবে দেশটির মাথাপিছু ঋণ প্রায় ৫২৯ ডলার। আফগানিস্তানের মোট ঋণ ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। দেশটির নিবন্ধিত জনসংখ্যা ৪ কোটি ৩৮ লাখ।
বৈশ্বিক চিত্রও উদ্বেগের। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ২০২৫ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের পর এটি বার্ষিক বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার। ওই বছর দেশগুলো আসল ও সুদ মিলিয়ে মোট ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। পরপর পঞ্চম বছর ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ল।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য বিভাগের পরিচালক হাইশান ফু বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ফিরে আসা ইতিবাচক। কিন্তু এসব দেশ বেশি ঋণ নিচ্ছে, বেশি পরিশোধও করছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই খুব কম সম্পদ অবশিষ্ট থাকছে। সহজ শর্তে অর্থায়নের যোগ্য দেশগুলোর ঋণের বোঝা আরও দ্রুত বেড়েছে। এসব দেশের বৈদেশিক ঋণ ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ঋণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকলেও এক দশকে তিন গুণ বৃদ্ধির প্রবণতা সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে। রপ্তানি আয় ও রিজার্ভ শক্তিশালী না থাকলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে। তাই ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

