জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান সংকট এবং শিল্পায়নের পরিবেশগত প্রভাব এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি আর্থিক খাতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে কোন ধরনের শিল্প, প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করছে, তার ওপর পরিবেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
ফলে প্রচলিত মুনাফাকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশেও এ প্রবণতা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং টেকসই অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে সবুজ অর্থায়নকে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের জটিলতা এবং বাজারের অনিশ্চয়তা সবুজ প্রকল্পেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়াই ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সবুজ অর্থায়ন ও টেকসই অর্থায়নের পার্থক্য কি? সবুজ অর্থায়ন বলতে এমন ঋণ ও বিনিয়োগকে বোঝায়, যার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো কার্যক্রমকে অর্থায়ন করা হয়। সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পরিশোধনাগার, জ্বালানিসাশ্রয়ী শিল্পপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ভবন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
অন্যদিকে টেকসই অর্থায়নের পরিসর আরও বিস্তৃত। এতে পরিবেশগত বিষয়গুলোর পাশাপাশি সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়ও বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক পরিচালনার মতো বিষয়গুলো টেকসই অর্থায়নের আওতায় আসে। ফলে সবুজ অর্থায়ন টেকসই অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দুটি ধারণা এক নয়। এই পার্থক্য না বুঝলে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের পরিসংখ্যান ও অগ্রগতি মূল্যায়নে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
নীতিমালার ধারাবাহিকতায় সবুজ ব্যাংকিং। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশনা জারি করে আসছে। ২০১১ সালের ৩০ জানুয়ারি পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং একই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব কার্যক্রমে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গ্রিন ব্যাংকিং নির্দেশিকা, ২০১৭ সালে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা এবং ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রিন বন্ড অর্থায়ন নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। ২০২৩ সালের ২২ অক্টোবর টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা হালনাগাদ করা হয়। পাশাপাশি ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ এবং ৬ নভেম্বর জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা জারি করা হয়।
এসব নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকের ঋণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি শনাক্ত করা, ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে অধিক সহনশীল ও টেকসই করে তোলা।
পরিসংখ্যানে সবুজ অর্থায়নের অগ্রগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের টেকসই অর্থায়নবিষয়ক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য তিন মাসে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৬ হাজার ১৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা সবুজ অর্থায়ন করেছে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ১০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিমাণ ১ হাজার ৫৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১৯৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক প্রান্তিকের ব্যবধানে সবুজ অর্থায়ন বেড়েছে ৯৬১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা প্রায় ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর সবুজ অর্থায়ন বেড়েছে ৪৪১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন বেড়েছে ৫২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা প্রায় ৯৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। ফলে আলোচ্য সময়ে সবুজ অর্থায়নের প্রবৃদ্ধিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানও উল্লেখযোগ্য ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৪১টি এবং ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান আলোচ্য সময়ে সবুজ অর্থায়নে অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনো এ ধরনের অর্থায়নে সক্রিয় নয়। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের পরিমাণ ও প্রকল্পের মান উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৬ হাজার ১৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা সবুজ অর্থায়ন করেছে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর অবদান ৫ হাজার ১০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান ১ হাজার ৫৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১৯৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ফলে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে সবুজ অর্থায়ন বেড়েছে ৯৬১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা প্রায় ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
তবে সামগ্রিক টেকসই অর্থায়নের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের ১ লাখ ৫৭ কোটি ২ লাখ টাকার তুলনায় ৪ হাজার ৫২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বা প্রায় ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একই প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে মোট টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা এ সময়ে মোট ঋণ বিতরণের ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে মোট সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৫৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা মোট মেয়াদি ঋণ বিতরণের ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ। উল্লেখ্য, ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও ১২ দশমিক ১৭ শতাংশের হিসাব দুটি শুধু এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের নয়; বরং জানুয়ারি-জুন ছয় মাসের সম্মিলিত পরিসংখ্যান।
কোন খাতে যাচ্ছে সবুজ অর্থায়নের অর্থ? সবুজ অর্থায়নের খাতভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্পকারখানার জ্বালানি ও সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়নের গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জ্বালানি ও সম্পদ দক্ষতা খাতে সবুজ অর্থায়ন হয়েছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। পরিবেশবান্ধব স্থাপনা খাতে অর্থায়ন হয়েছে ৮৪৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বৃত্তাকার অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৫০২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
একই সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন হয়েছে ৪৬৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সবুজ সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল অর্থায়নে ৫৬৮ কোটি টাকা, সবুজ ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতে ২০০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং সবুজ কৃষি খাতে ৬৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন হয়েছে ৩৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিকল্প জ্বালানি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নীল অর্থনীতি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য খাতেও অর্থায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সবুজ অর্থায়নের স্থিতি ছিল ৮১ হাজার ৪১০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এই স্থিতির মধ্যে জ্বালানি ও সম্পদ দক্ষতা খাতে ৩৩ হাজার ৬১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং পরিবেশবান্ধব স্থাপনা খাতে ১৮ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা রয়েছে। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৬ হাজার ১৭৪ কোটি ৯ লাখ টাকা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ৫ হাজার ৯৩২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং বৃত্তাকার অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ৫ হাজার ৪৫৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা স্থিতি রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রান্তিকভিত্তিক অর্থায়নের পরিমাণ এবং নির্দিষ্ট তারিখে ঋণের স্থিতি এক বিষয় নয়। প্রথমটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে কত টাকা বিতরণ করা হয়েছে তা নির্দেশ করে, আর দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট সময়ে ওই খাতে মোট কত ঋণ বকেয়া বা স্থিতিতে রয়েছে তা বোঝায়। তাই দুটি পরিসংখ্যানকে একই অর্থে ব্যবহার করা যাবে না। খাতভিত্তিক হিসাব থেকে বোঝা যায়, শিল্পকারখানার জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনায় বড় অঙ্কের অর্থায়ন থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিল্পকারখানায় জ্বালানির ব্যবহার, পানি দূষণ, বর্জ্য নিঃসরণ এবং অপরিকল্পিত উৎপাদন পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বস্ত্র, তৈরি পোশাক, চামড়া, রাসায়নিক ও অন্যান্য উৎপাদনশীল শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য পরিশোধনাগার এবং পানি পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংকের অর্থায়ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত মান বজায় রেখে উৎপাদন চালাতে সহায়তা করতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও ব্যাংকগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস এবং অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানো গেলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব প্রকল্পে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রযুক্তি নির্বাচন, জমি ও অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। শুধু পরিবেশবান্ধব পরিচয় থাকলেই কোনো প্রকল্প লাভজনক বা ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায় না।
পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পকারখানার আধুনিকায়নেও অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশগত সুফল, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় যাচাই করে ঋণ দিতে হবে।
পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা ও সবুজ অর্থায়নের প্রসার। সবুজ অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাও চালু করেছে। পরিবেশবান্ধব পণ্য ও উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য ২০০৯ সালে নিজস্ব তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর আওতায় সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস, বর্জ্য পরিশোধনাগারসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তহবিলের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা থেকে ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০২৩ সালে তা বাড়িয়ে ১ হাজার কোটি টাকা করা হয় এবং পণ্যের তালিকা ১১টি শ্রেণির আওতায় ৭০টিতে সম্প্রসারণ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচি শুরুর পর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ তহবিলের আওতায় মোট বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এ ক্ষেত্রে ২০২২ সালের ২৪ জুলাইয়ের তারিখকে কর্মসূচি চালুর সময় হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক নয়। ওই সময়ের সার্কুলারটি পুনঃঅর্থায়ন-সংক্রান্ত নির্দেশনার অংশ; পরিবেশবান্ধব পণ্য ও উদ্যোগের মূল পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৯ সালে।
এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নের জন্য গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড বা জিটিএফ রয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল চালু করা হয়, যা রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও চামড়াশিল্পের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে সহায়তা করে। পরে এর সঙ্গে ২০০ মিলিয়ন ইউরো যুক্ত করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ৫ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক জিটিএফ চালু করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ তহবিলের আওতায় ১১৫টি গ্রাহকের অনুকূলে ৩ হাজার ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব পণ্য পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি ও জিটিএফ আলাদা উদ্যোগ; তাই দুটির অর্থায়ন ও তহবিলের হিসাব পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবুজ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের আরেকটি সম্ভাব্য উৎস হলো গ্রিন বন্ড। এ ধরনের বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো নির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রিন বন্ড অর্থায়ন নীতিমালা প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ব্র্যাক ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড ইস্যুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। প্রস্তাবিত বন্ডটি সিনিয়র আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল এবং সম্পূর্ণ রিডিমেবল কাঠামোর। এর অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন এবং শিল্পকারখানার জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর প্রকল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বন্ডটি ১৫ নভেম্বর থেকে ইস্যুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তাই একে ইতিমধ্যে ইস্যু করা বন্ড না বলে ইস্যুর উদ্যোগ বা পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করাই সঠিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন বন্ড নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো ব্যাংকের এ ধরনের বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাই ও গ্রিনওয়াশিংয়ের আশঙ্কা। সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের প্রকৃত পরিবেশগত সুফল যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিবেশবান্ধব দাবি করলেই তার প্রকল্পকে সবুজ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। প্রকল্পের বাস্তব কার্যক্রম, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই না করে অর্থায়ন করলে গ্রিনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃত পরিবেশগত অবদান সীমিত হলেও প্রচার বা নথিপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
এ ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়ার আগে প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। ঋণ অনুমোদনের পরও প্রকল্পের অগ্রগতি, পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ এবং অর্থের নির্ধারিত ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকার উদ্দেশ্যও এ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা।
২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৬টি এবং ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছে। এ সময়ে মোট ২ লাখ ৭ হাজার ২৯৯টি প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। মূল্যায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অর্থায়ন করা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৩টিতে; এসব প্রকল্পে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৬ কোটি ২ লাখ টাকা। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি মূল্যায়নের কাঠামো বিস্তৃত হচ্ছে। তবে মূল্যায়নের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যায়নের মান, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং ঋণ-পরবর্তী নজরদারি নিশ্চিত করাও জরুরি।
সবুজ অর্থায়নের প্রসারের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকের মূলধন, তারল্য, নতুন ঋণ বিতরণ এবং ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সবুজ অর্থায়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক বিশেষায়িত প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়াতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি। তবে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানকে সবুজ অর্থায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত করে দেখা ঠিক হবে না। এটি ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার একটি আলাদা সূচক, যা নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা মূল্যায়নে প্রাসঙ্গিক।
টেকসই অর্থায়নে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের অগ্রগতি ইতিবাচক হলেও এর পরিমাণ, খাতভিত্তিক বণ্টন এবং প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল নিয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে শুধু অর্থ বিতরণের পরিমাণ নয়, অর্থায়নের ফলে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে, দূষণ কতটা কমেছে, কত পানি পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে কী অবদান এসেছে—এসব তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সবুজ অর্থায়নের সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাসে একক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একই প্রকল্পকে ভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে পরিসংখ্যানে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কাছে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ থাকলেও অর্থের অভাব, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং জামানতসংক্রান্ত জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ, উপযুক্ত পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং কারিগরি সহায়তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, ব্যাংকগুলোকে জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ঋণ মূল্যায়নের পদ্ধতি উন্নত করতে হবে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি কোনো প্রকল্পের উৎপাদন, সম্পদ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতার পাশাপাশি জলবায়ুজনিত ঝুঁকিও ঋণ অনুমোদনের সময় বিবেচনা করা দরকার।
সবুজ অর্থায়ন কেবল ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা, উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে এ খাতে বিনিয়োগের সাফল্য শুধু অর্থের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যাবে না। অর্থায়ন কতটা কার্যকর প্রকল্পে যাচ্ছে, প্রকল্পগুলো পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং ঋণগ্রহীতারা নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি টেকসই অর্থায়নের নীতিগত কাঠামোও বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ব্যাংকিং খাতের আর্থিক চাপ বিবেচনায় এ অগ্রগতিকে আরও কার্যকর করতে হবে। ব্যাংকগুলো যদি প্রকল্প যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং পরিবেশগত ফলাফল পরিমাপের ওপর গুরুত্ব দেয়, তাহলে সবুজ অর্থায়ন দেশের অর্থনীতিকে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

