দেশের ব্যাংকিং খাত এমন এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে আছে—বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে চলছে বড় রকমের রদবদল। তারল্য সংকট, অনিয়ম, দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের মতো দফায়–দফায় ধাক্কায় অনেক গ্রাহক নিজেদের সঞ্চয় তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবুও সামগ্রিক আমানত বাড়ছে। এ যেন আস্থা–সংকটের মাঝেও মানুষের অনিচ্ছুক এক নির্ভরতা—সব সমস্যার পরও ব্যাংকই এখনও শেষ আশ্রয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ, যা গত দেড় বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির একটি। আগস্টে এই হার ছিল আরও সামান্য বেশি—১০.০২ শতাংশ।
অর্থাৎ, টানা ১৩ মাস ৯ শতাংশের নিচে ঘোরাঘুরি করা আমানত প্রবৃদ্ধি এখন আবার উত্থানের পথ পাচ্ছে।
সেপ্টেম্বর শেষে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১৯.১৪ লাখ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৭৩ লাখ কোটি টাকা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরে আসার একটি সংকেত—যদিও এটি এখনও অস্থির ও নড়বড়ে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র: কোটিপতি আমানতকারীরা ব্যাংক ছাড়ছেন দ্রুত
সংকটের সময়ে সাধারণ আমানতকারীরা ব্যাংকের ওপর ভরসা রাখলেও ধনী গ্রাহকদের আচরণ সম্পূর্ণ উল্টো। মাত্র এক বছরে:
-
৫০ কোটি টাকার বেশি আমানতধারীর হিসাব ৭২টি থেকে নেমে ২৬টিতে
-
২৫–৫০ কোটি টাকার হিসাব অর্ধেকে নেমে ৭৮টিতে
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বড় আমানতকারীদের এমন দ্রুত ‘পিছিয়ে যাওয়া’ খুব কমই দেখা গেছে।
এই সরে যাওয়া অর্থ যাচ্ছে—
রিয়েল এস্টেট, স্বর্ণ, বিদেশমুখী বিনিয়োগ, হুন্ডি ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে।
অনেকে এটি দেখছেন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জবাবদিহির নতুন পরিবেশে বড় ব্যবসায়ীদের ‘সেফ জোন’ খোঁজার প্রচেষ্টা হিসেবে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বড় অঙ্কের টাকার মালিকদের মধ্যে বাস্তবিকই নতুন এক সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
মোটের ওপর বড় ধনীরা অপেক্ষা করছেন—নতুন সরকার কতটা স্থিতিশীল হয়, কী নীতি নেয়, দুর্বল ব্যাংকগুলোর ভাগ্য কী হয়, সবকিছু দেখে শুনে তারা আবারও ফিরে আসবেন কিনা তখনই সিদ্ধান্ত নেবেন।
বড় অঙ্কের আমানত কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তীব্র
বড় আমানত ব্যাংকের জন্য ঠিক অক্সিজেনের মতো। একটি বড় আমানত কমে যাওয়া মানে শুধু টাকার ক্ষতি নয়—ব্যাংকের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা কেঁপে ওঠা।
ফলে দেখা দিচ্ছে কয়েকটি সংকট:
১. তারল্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়া
অনেক ব্যাংক এখন গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে।
২. দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণে অনীহা
ছোট আমানতের ওপর নির্ভর করলে ব্যাংক বড় প্রকল্প ঋণ দিতে সাহস করে না।
৩. ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া
ধনী গ্রাহকরা যখন টাকাটা সরিয়ে নিচ্ছেন, তখন সাধারণ মানুষও দ্বিধায় পড়ে—ব্যাংক কি সত্যিই নিরাপদ?
৪. দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও ঝুঁকিতে
যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণে ডুবে আছে, সেখানে বড় আমানত কমে গেলে তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ই এখন ব্যাংকিং খাতের নতুন ‘রক্ষাকবচ’
সংকটের এই সময়ে সবচেয়ে আশার কথা—বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হচ্ছেন।
এক বছরে:
-
০–২ লাখ টাকার হিসাব বেড়েছে ১.৫ কোটি
-
২–২৫ লাখ টাকার হিসাব ৮৮.৭৭ লাখ থেকে বেড়ে ১.০২ কোটি
-
২৫–৫০ লাখ টাকার হিসাব ৪.০৯ লাখে পৌঁছেছে
-
৫০ লাখ–১ কোটি টাকার হিসাবও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে
এ প্রবৃদ্ধি দেখায়—
বাংলাদেশে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার অর্থনৈতিকভাবে আরও সচেতন হচ্ছে ও সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই উত্থান দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।
আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ: সাধারণ মানুষের জন্য আশার আলো
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে সরকার সম্প্রতি ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে—যদি কোনও ব্যাংক দেউলিয়া বা অবসায়ন হয়, তাহলে আমানতকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স বিভাগ জানিয়েছে, নতুন কাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষা আরও দ্রুত ও দক্ষভাবে নিশ্চিত করবে।
অর্থাৎ সাধারণ আমানতকারীর জন্য ব্যাংকে টাকা রাখা এখন আগের চেয়ে কিছুটা হলেও নিরাপদ।
অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে যাচ্ছে, বিনিয়োগে মন্থরতা তীব্র
অপরদিকে, ব্যাংক খাতে আরেক ধরনের অস্বস্তির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে—অতিরিক্ত তারল্য দ্রুত বেড়ে চলছে। কারণ, আমানত বাড়লেও ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত ঋণ বিতরণ করছে না। ফলে টাকা জমা হয়ে ‘অচল সম্পদে’ পরিণত হচ্ছে।
২০২৫ সালের আগস্ট শেষে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরে বেড়েছে ১.৩১ লাখ কোটি টাকা।
বেসরকারি ব্যাংকে এই অতিরিক্ত তারল্য সর্বোচ্চ, আর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর অবস্থাও ভালো নয়।
বিশ্লেষকদের মতে—রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়িক পরিবেশের স্থবিরতা, ঋণখেলাপির ঝুঁকি এবং দুর্বল ব্যাংকের নীতি ব্যাংকগুলোকে নতুন ঋণ দিতে নিরুৎসাহিত করছে।
কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন ‘দ্বৈত প্রবাহে’ দাঁড়িয়ে—
-
ধনীদের টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
-
সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে ঢুকছে দ্রুত।
এই অবস্থায় ব্যাংক খাতের সামনে এখন তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ—
১. দুর্বল ব্যাংকগুলো দ্রুত সংস্কার ও একীভূতকরণ
২. খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ
৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো
আর সবচেয়ে বড় বিষয়—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। গতিশীল ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া বড় অঙ্কের আমানত আবার ব্যাংকে ফিরবে না।

