দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের এক–তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। দীর্ঘদিনের এ সংকট থেকে বের হতে অন্তত পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
আজ শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন–২০২৫’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শিরোনামের এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে দৈনিক বণিক বার্তা।
গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ এখন ছোট কোনো সমস্যা নয়। এটি পুরো আর্থিক খাতকে চাপের মধ্যে রেখেছে। তিনি জানান, প্রতি প্রান্তিকে নতুন তথ্য যোগ হচ্ছে এবং নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণ আরও বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে আমার ধারণা ছিল খেলাপি ঋণ ২৫ শতাংশের মতো। সরকার তখন বলেছিল এটি ৮ শতাংশ। এখন দেখা যাচ্ছে মোট ঋণের ৩৫ শতাংশই খেলাপি।’ তাঁর মতে, পরিস্থিতি রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে এবং পুরোপুরি উত্তরণে অন্তত পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগবে। ডলার পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নর বলেন, ‘আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে। তাই এ বছর রমজানে ঋণপত্র খোলা ও পণ্য আমদানি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই।’
উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন।
হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা উদ্বেগজনক। বিআইডিএস মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের করব্যবস্থা এখনও ‘জমিদারি ব্যবস্থার’ মতো আচরণ করে। ব্রিটিশ আমলে জমিদারদের কাজ ছিল শুধু কর আদায়, দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব ছিল না। আজও কর ব্যবস্থায় সেই মনোভাবের ছাপ দেখা যায়।
কর আদায়ের পদ্ধতিতে এখনো জমিদারির ছাপ রয়ে গেছে:
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলার মজুত রয়েছে। তিনি জানান, এ বছর রমজানকে সামনে রেখে ঋণপত্র খোলা ও পণ্য আমদানি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ঋণপত্র খোলা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এখনো অনেকটা ‘চোর ধরার’ মানসিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। তিনি বলেন, একটি অর্থনীতি যদি আস্থাহীন হয় তবে ব্যবসা ও বিনিয়োগ আত্মবিশ্বাস হারায় এবং প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ে। আস্থা ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।
এনামুল হক আরও বলেন, দেশে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলেও তাদের কাজ করার মতো দৃঢ় দায়বদ্ধতার কাঠামো নেই। তাঁর ভাষায়, দেশের করব্যবস্থা আজও ‘জমিদারি ব্যবস্থার’ মতো আচরণ করে। ব্রিটিশ আমলে জমিদারের কাজ ছিল শুধু কর আদায়, দেশের উন্নতি ছিল না তাদের দায়িত্ব। আজও কর সংগ্রহে সেই মনোভাব দেখা যায়—যেন কর আদায়ই মূল লক্ষ্য, উন্নয়ন নয়। সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে ধীরে ধীরে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। আগে বোর্ডরুমে বসে যেভাবে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, সেই অনিয়ম এখন আর নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনীতির চিত্র উদ্বেগজনক:
হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চিত্র উদ্বেগজনক। তিনি জানান, বিভিন্ন সূচকে দেশ ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির কারণে সুদের হার বেড়েছে, যা বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাঁর ভাষায়, প্রাইভেট সেক্টর এখন মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ পাচ্ছে, ফলে শিল্পায়ন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি কোম্পানি লাভ করুক বা লোকসান করুক, কোম্পানিকে কর দিতেই হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও লোকসানেও কর দেওয়ার নিয়ম আছে কি না তা তাঁর জানা নেই।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে এখন ধীরে ধীরে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। আগে বোর্ডরুমে বসেই ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, এখন নিয়ম মেনে অনুমোদন হচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি বিচার করে সময় নিচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর বিনিয়োগের পরিবেশ ভালো হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

