পরিবেশ রক্ষার মহৎ লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ)। উদ্দেশ্য ছিল শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রোৎসাহন। নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছিল দ্বিস্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থা। কিন্তু সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই দুর্নীতির পথে ঢুকে পড়ল কয়েকজন। সবুজ টাকার লোভে হারিয়ে গেল দায়িত্ব ও বিবেক।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৬ সালে ২১০ মিলিয়ন ডলারের এই রিফাইন্যান্সিং স্কিম চালু করে। পরে এতে আরও ২০০ মিলিয়ন ইউরো যোগ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানি ও উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে। সেই ব্যাংকগুলো পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনরায় অর্থায়ন সুবিধা পাবে। প্রকল্প গ্রহণের আগে অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সরেজমিনে যাচাই করতে হতো।
কাগজে-কলমে প্রকল্প যাচাইয়ের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা পরিণত হয়েছিল ভ্রমণবিলাসে। অফিস কর্মীরা প্রকল্প পরিদর্শনের নামে সফর ও পিকনিকে ব্যস্ত থাকতেন। কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দিয়ে কেবল নিজের উপস্থিতি ছাপানোর চেষ্টা করেছেন। অথচ যেসব প্রকল্পে ঋণ বিতরণ হয়েছে, তার অনেকের অস্তিত্ব কেবল নামেই টিকে আছে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের অধীনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই ফান্ড থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান প্রকৃতভাবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছে, তার সংখ্যা খুবই সীমিত।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) থেকে মাত্র ১.৩১ শতাংশ সুদে ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলস নিয়েছে দুই কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি ঋণ। একই মালিকানাধীন ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলস-২ নিয়েছে আরও দুই লাখ ৭৫ হাজার ডলার এবং ৩৩ লাখ ইউরো। কিন্তু বর্তমানে এ ঋণ সব খেলাপি। ২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকেও এস আলমের মেয়েজামাই বেলাল আহমেদের প্রতিষ্ঠান ইউনিটেক্স কম্পোজিট লিমিটেড নেয় এক কোটি ২৬ লাখ ইউরোর ঋণ। তবে এসব ঋণ এখন আর ফেরত আসছে না।
ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তখনকার আওয়ামী সরকারের সরাসরি প্রভাব থাকার অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এস আলম লাপাত্তা, প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি আর ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দায়ে জর্জরিত। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, ডলারও নেই হাতে। ফলে পরিবেশ রক্ষার নামে দেওয়া সেই ঋণ এখন ব্যাংকগুলোর জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও দুঃখজনক হলো, ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের সম্পত্তির মূল্য আসল ঋণের অর্ধেকেরও কম। শর্ত ছিল, প্রকল্পের মোট খরচের ৭০ শতাংশ ঋণ দেওয়া যাবে, বাকি অংশ যোগ করবে মালিকপক্ষ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মালিকপক্ষ ফাঁকি দিয়েছেন। ফলে সেই সম্পত্তি বিক্রি করেও পুরো টাকা আদায় করা সম্ভব হবে না। ব্যাংকারদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তারাও এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছেন। যাঁদের দায়িত্ব ছিল প্রকল্প যাচাই ও তদারকি, তাঁরা রিপোর্টে ‘সব ঠিক আছে’ বলে সিল মেরে দিয়েছেন।
ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলসের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য তালিকায়ও কোম্পানির উৎপাদন বিষয়ক কোনো তথ্য নেই। তালিকায় শুধু নাম, ঠিকানা ও তিনটি ফোন নম্বর দেওয়া আছে। কিন্তু সেই নম্বরগুলো বন্ধ। ফেসবুকে দেওয়া একটি নম্বর আছে, যা ইনফিনিয়া গ্রুপের একজন কর্মকর্তা ব্যবহার করেন। তবে তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়ে কিছুই জানেন না। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) জানাচ্ছে, প্রকল্পটি শুরুতে ভালো ছিল। কিন্তু সরকার বদলের পর থেকে ব্যাংক আর টাকা দিতে পারছে না। এখন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ডলার না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে ব্যাংকটি খেলাপি হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি বা স্থাবর সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যাংকের দেনা আদায়ও সম্ভব নয়।
এসআইবিএলের এমডি শফিউজ্জামান বলেন, জিটিএফের ঋণ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি ভালো ছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো চলমানও ছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর মালিকরা পলাতক। এ ছাড়া এলসিও না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ব্যাংক চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করে অর্থ ফেরত আনার। তবে ঋণসংক্রান্ত জটিলতায় প্রকৃত মূল্য পাওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ দুর্বল পাঁচ ব্যাংক একত্রিকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন রিপোর্ট বলছে, শুধু এসআইবিতে ইনফিনিয়া স্পিনিং মিলসের ঋণের পরিমাণ মোট ৮৯১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮৯০ কোটি ৯ লাখ টাকা খেলাপি। বাকি ৮৯ লাখ টাকাও খেলাপি হওয়ার পথে। ব্যাংকের ভাষায় এটি এসএমএ (স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট) বা কম ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি। এক মাসের মধ্যে এটি পুরোপুরি মন্দ ঋণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক জানিয়েছেন, ইউনিটেক্স কম্পোজিট ২০২১ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জিটিএফ ফান্ড থেকে ঋণ নিয়েছিল। শুরুতে ঋণটি নিয়মিত থাকলেও এখন তা খেলাপি। তিনি বলেন, “আমরা চিন্তা করছি কিভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়। এই দেনাটা একসঙ্গে পরিশোধ করা যায় কি না তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। দেনা পরিশোধ না হলে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে খেলাপি ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতে পারি।”
এস আলমের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও জিটিএফ ঋণ খেলাপি তালিকায় রয়েছে এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক ইউনিটেক্স সিলিন্ডার লিমিটেড। এই কোম্পানির ঋণের পরিমাণ ৩৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৭ ডলার। একই ব্যাংক থেকে ইউনিটেক্স স্পিনিং নিয়েছে ৫৬ লাখ ৯২ হাজার ডলার এবং প্রায় ৬০ লাখ ইউরোর সবুজ ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “জিটিএফ ফান্ড থেকে দেওয়া ঋণ খেলাপির দিকে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এই ঋণ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই এবং সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। এর পরও খেলাপি হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরেজমিন পরিদর্শনের কোনো গাফিলতি হয়েছে কি না তা আমরা খতিয়ে দেখব। তদারকিতে ঘাটতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করা হবে।”

