মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্য। এ অবস্থায় মেইন লাইন শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন করে জাহাজভাড়া বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি খরচে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই ইউরোপগামী কনটেইনার ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য রুটে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় ভাড়া কয়েক গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিপিং লাইন সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন বেস পোর্টে একটি ৪০ ফুট কনটেইনার পাঠাতে খরচ ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ ডলার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চের শুরুতেই মেইন লাইন অপারেটররা ভাড়া বাড়িয়েছে। বর্তমানে একই কনটেইনার পরিবহনে খরচ কোম্পানিভেদে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রগামী রুটে সরাসরি ভাড়া না বাড়ানো হলেও প্রতি কনটেইনারে ৩০০ ডলার বাংকারিং চার্জ আরোপ করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই রুটে ভাড়া ছিল ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ডলারের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্য রুটে ধাক্কা সবচেয়ে বেশি। ফেব্রুয়ারিতেও যেখানে একটি কনটেইনার পাঠাতে খরচ হতো ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার, বর্তমানে কার্যত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। বড় শিপিং লাইনগুলো ঝুঁকি এড়িয়ে চলায় সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে এবং সেগুলোর ভাড়া এখন ৪ হাজার ডলারের ওপর পৌঁছেছে।
শিপিং কোম্পানিগুলো ১ এপ্রিল থেকে ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি ও যুদ্ধ ঝুঁকি ভাড়া বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট হারে ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা এখনও হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন এপ্রিলেও মার্চের মতো ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়তে পারে। মেইন লাইন অপারেটররা ইতোমধ্যে বিষয়টি স্থানীয় এজেন্টদের মৌখিকভাবে জানিয়েছেন এবং আজ মঙ্গলবার লিখিতভাবে জানানো হবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. আরিফ বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু ওই অঞ্চলের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিয়ে লোকাল বাজারে জ্বালানি দাম নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এর সঙ্গে সমুদ্রপথে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে।”
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুল আলম সুজন জানান, “কেবল কনটেইনার পরিবহন নয়, বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়াও অন্তত ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালী ও রেড সি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ। হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হতে পারে, যা সময় ও খরচ দুইই বাড়াবে।”
তিনি আরও বলেন, “এপ্রিলের জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে মেইন লাইন অপারেটররা ভাড়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও কয়েকগুণ বেশি ভাড়া বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।”
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস. এম. আবু তৈয়ব মন্তব্য করেন, “হঠাৎ করে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত। অধিকাংশ অর্ডার নেওয়া হয়েছিল ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে, তখনকার ভাড়া কাঠামো অনুযায়ী। এখনকার বাড়তি ভাড়া ওই অর্ডারে ধরা হয়নি। বায়াররা অতিরিক্ত টাকা দেবে না, তাই গার্মেন্ট মালিকদেরই তা বহন করতে হবে।”
বৈশ্বিক এই সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম। তাই সরকারকে পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে মনিটর করতে হবে। শিপিং লাইনগুলো কতটা যৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়াচ্ছে এবং এর প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—সেসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অস্থিরতা আরও বাড়বে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে।

