দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সি অ্যান্ড এফ) এজেন্ট খাত। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, নথিপত্র যাচাই-বাছাই, শুল্ক ও কর পরিশোধে সহায়তা, এবং বন্দর ও কাস্টমস স্টেশনভিত্তিক প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহযোগিতা এসব ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। দেশের প্রধান বন্দর ও কাস্টমস স্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই খাত শুধু ব্যবসা নয়, এটি দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় ক্ষেত্র এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার উৎস।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন (এসআরও নং-০৪-আইন/২০২৬/কাস্টমস, ৮ জানুয়ারি ২০২৬) এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমি, চট্টগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে নতুন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানিকেও লাইসেন্স প্রদানের যোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বিদেশি অংশীদারিত্বের সর্বোচ্চ সীমা ৪৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা মূলত কাস্টমস অনুমোদিত ব্রোকারভিত্তিক পেশা, যার কার্যক্রম দেশের অভ্যন্তরীণ আইন, কাস্টমস প্রশাসন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই খাত মূলত বাংলাদেশের কাস্টমস স্টেশনগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং এটি আন্তর্জাতিক এজেন্সিভিত্তিক সেবা নয়। ফলে বিদেশি অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদেশি শিপিং লাইন ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের সরাসরি সম্পর্কও শক্তিশালী। যদি তারা যৌথ মালিকানার মাধ্যমে সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স পায়, তাহলে নমিনেশনভিত্তিক ব্যবসা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সহজ হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডোর-টু-ডোর লজিস্টিকস চুক্তির আওতায় পণ্য প্রেরণ ও সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়া একই বিদেশি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হলে, স্থানীয় ক্লিয়ারিং ফরওয়ার্ডিং ব্যবসায়ীদের ভূমিকা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের বাণিজ্যিক তথ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে, যা বাজারের প্রতিযোগিতার ভারসাম্যকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রা বহির্গমনের সম্ভাবনা। যৌথ মালিকানায় আয়ের একটি অংশ বিদেশি অংশীদারদের লভ্যাংশ হিসেবে তাদের দেশে চলে যেতে পারে। জালিয়াতি বা রাজস্ব ফাঁকিতে জড়িত হলে, বিদেশি অংশীদারকে আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে যায়। দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত ব্যবসায় এই ঝুঁকি কমানো সহজ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের আমদানি প্রায় ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রপ্তানি প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলার। রাজস্ব আদায়ে দেশীয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অবদানও উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় ৫১,৫৭৬ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে ৫৯,২৫৬ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৬১,৩৫০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ এ ৬৮,৮৬৬ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ এ ৭৬,১৪২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। মাত্র পাঁচ বছরে রাজস্ব প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবাহ নিশ্চিত করেছে দেশীয় ক্লিয়ারিং এজেন্টরা।
এই বাস্তবতায় দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানায় সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো। এটি শুধু পেশাগত স্বার্থের প্রশ্ন নয়, জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

