বাংলাদেশ গত দুই দশকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, প্রবাসী আয় এবং তরুণ জনশক্তির কারণে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশটি মধ্যম মানের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে। তবে তৈরি পোশাক নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক জার্নালের ‘বাংলাদেশ অ্যাস এ ফ্রান্টিয়াল মার্কেট: গ্রোথ, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, গ্যাপস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট রিস্কস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেশি থাকায় রপ্তানিমুখী খাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হয়েছে। তবে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬০.৯ শতাংশ থেকে ৫৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যার প্রধান কারণ নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৮ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬.৩ শতাংশ হতে পারে। আইএমএফ বলেছে, আর্থিক ও রাজস্ব নীতি বজায় রাখলে ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৭ শতাংশ হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে পোশাক রপ্তানির মূল্য প্রায় ৩৮.৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র যথাক্রমে ৫০ শতাংশ এবং ১৮.৭২ শতাংশ দখল করে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা মিলিয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও তুরস্কসহ অন্যান্য বাজার প্রায় ১৬ শতাংশ রপ্তানি আয়ের উৎস।
গত দুই দশকে পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৬ সালের ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই একক খাত থেকে, যা এক ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকি নির্দেশ করে। সেই সঙ্গে প্রবাসী আয়ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করছে।
তবে উচ্চমূল্যের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আইএমএফের মতে, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং জটিল বিধি-নিষেধ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ঋণ পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। তাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) উন্নয়ন, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং বৈশ্বিক শুল্ক সংস্কার বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার, যেখানে প্রায় ১৮ শতাংশ রপ্তানি হয়। তবে শুল্ক, শ্রমমান ও সরবরাহ শৃঙ্খলার নিয়ম বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ করছে। উৎপাদন খরচ কম হলেও প্রায় ১৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, যা লাভের মার্জিন কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই সুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা শক্তি হ্রাস পাবে। তাই শ্রম, পরিবেশ ও পণ্যের মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ঝুঁকি কমাতে চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশলসহ উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন।
অবকাঠামো ও লজিস্টিক সমস্যা বিনিয়োগের দক্ষতা কমাচ্ছে। বন্দর জট ও পরিবহন বিলম্ব রপ্তানি ব্যয় বাড়াচ্ছে। যদিও গভীর সমুদ্রবন্দর ও রেল উন্নয়ন প্রকল্প চলছে, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। উচ্চ শুল্ক এবং কঠোর মানদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় ঝুঁকি তৈরি করছে।
রপ্তানি খাতের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় এটি বড় ঝুঁকি। বৈশ্বিক চাহিদা বা নীতির পরিবর্তনে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই উচ্চমূল্যের পোশাক, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, ফার্মাসিউটিক্যাল ও আইসিটি খাতের বিকাশ জরুরি।
উচ্চ প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখোমুখি। সরকার, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত উদ্যোগে এই ঝুঁকি কমানো এবং বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

